১২২ বছরের পুরোনো লজ্জার রেকর্ডে ম্যানসিটি

মৌসুমের শুরুতে টানা সাত জয়। মনে হচ্ছিল, প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা পুনরুদ্ধারে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটি। অথচ পরের তিন ম্যাচেই সব হিসাব পাল্টে গেল। অ্যাস্টন ভিলা ও ব্রাইটনের পর নটিংহাম ফরেস্টের কাছেও হেরেছে এনজো মারেসকার দল। তাতে শুধু শিরোপার দৌড়েই বড় ধাক্কা খায়নি সিটি, নাম লিখিয়েছে ইংলিশ ফুটবলের ১২২ বছরের পুরোনো এক অস্বস্তিকর ইতিহাসেও। ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে প্রথম সাত ম্যাচ জেতার পর টানা তিন ম্যাচ হারের ঘটনা এর আগে ঘটেছিল মাত্র একবার।
সেটি ১৯০৪-০৫ মৌসুমে। সেবার ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে প্রথম সাত ম্যাচ জয়ের পর টানা তিন ম্যাচ হেরেছিল শেফিল্ড ওয়েডনেসডে। এরপর দীর্ঘ ১২২ বছরে আর কোনো দল এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি। শনিবার (৭ নভেম্বর) নটিংহাম ফরেস্টের মাঠে ৩-১ গোলে হেরে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে ভাগ বসাল ম্যানচেস্টার সিটি।
অথচ মৌসুমের শুরুটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। প্রথম সাত লিগ ম্যাচের সবগুলো জিতে পূর্ণ ২১ পয়েন্ট তুলে নিয়েছিল মারেসকার দল। সেই সময় শিরোপার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল সিটি। কিন্তু অক্টোবরের শেষ ভাগ থেকেই বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি।
গত ২৪ অক্টোবর অ্যাস্টন ভিলার মাঠে ২-১ গোলে হেরে প্রথম ধাক্কা খায় সিটি। এক সপ্তাহ পর নিজেদের মাঠ ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ব্রাইটনের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হয় তারা। এরপর শনিবার নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে ৩-১ গোলের হার। প্রথম সাত ম্যাচে কোনো পয়েন্ট না হারানো দলটি পরের তিন ম্যাচ থেকে সংগ্রহ করতে পারেনি একটি পয়েন্টও।
শুধু ফলাফল নয়, সিটির রক্ষণভাগের দুর্বলতাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শেষ তিন লিগ ম্যাচের প্রতিটিতেই প্রথম ১১ মিনিটের মধ্যে গোল হজম করেছে তারা। অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ষষ্ঠ মিনিটে, ব্রাইটনের বিপক্ষে ১১তম মিনিটে এবং নটিংহাম ফরেস্টের বিপক্ষে আবারও ষষ্ঠ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে সিটি।
এই তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে মাত্র দুটি গোল করতে পেরেছে মারেসকার দল। বিপরীতে হজম করেছে ছয়টি। প্রতিবারই শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফেরার জন্য লড়তে হয়েছে তাদের।
ফরেস্টের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই দুর্বলতারই বড় উদাহরণ। ষষ্ঠ মিনিটে ইয়োশকো গাভার্দিওলের ভুলে বল পেয়ে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন জাইর কুনিয়া। ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন সিটির সাবেক ফরোয়ার্ড লিয়াম ডেলাপ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রায়ান শেরকির দুর্দান্ত গোলে ব্যবধান কমালেও ম্যাচে ফিরতে পারেনি সিটি। উল্টো ৭৩ মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ফরেস্টের জয় নিশ্চিত করেন ডেলাপ।
এই ম্যাচের পরিসংখ্যানও সিটির সমস্যার চিত্র তুলে ধরছে। ম্যাচে ৭৮ শতাংশ বলের দখল ছিল সফরকারীদের। বিপরীতে মাত্র ২২ শতাংশ বলের দখল নিয়েও তিনটি গোল করেছে ফরেস্ট। স্কাই স্পোর্টসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো ম্যাচে সিটির চেয়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার বেশি দৌড়েছেন স্বাগতিক ফুটবলাররা।
ম্যাচের পর দলের পারফরম্যান্সে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মারেসকা। বিশেষ করে প্রথমার্ধে খেলোয়াড়দের লড়াকু মানসিকতা ও তীব্রতার অভাবকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ইতালিয়ান এই কোচ।
মারেসকা বলেন, ‘প্রথমার্ধে আমরা প্রতিপক্ষের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারিনি। অনেক লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েছি। এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
সিটির কোচের মতে, বলের দখল ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে আরও কার্যকর হতে হবে তার দলকে। বিশেষ করে মাঝমাঠের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়া এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ সামলাতে না পারার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
তবে টানা তিন হারের পরও আতঙ্কিত হতে রাজি নন মারেসকা। আন্তর্জাতিক বিরতিতে দলের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সমাধান খুঁজতে চান তিনি।
মারেসকা বলেন, ‘আমরা প্রথম সাত ম্যাচ জিতেছি, এরপর তিনটি হেরেছি। তাই ভারসাম্য ধরে রাখতে হবে। কোথায় উন্নতি করা প্রয়োজন, সেটি বুঝতে এই বিরতি কাজে লাগাব।’
সিটির এই ব্যর্থতার সুযোগে শিরোপার দৌড়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে আর্সেনাল। শনিবার হাল সিটিকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১০ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মিকেল আর্তেতার দল। সমান ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে তাদের চেয়ে ছয় পয়েন্ট পিছিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি।
অথচ দুই সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি এতটা কঠিন ছিল না মারেসকার দলের জন্য। টানা সাত জয়ের ধারাবাহিকতায় শীর্ষস্থান নিয়ে লড়াই করছিল তারা। এখন সেই দলকেই পিছিয়ে পড়া ছয় পয়েন্টের ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।
আগামী ২১ নভেম্বর ফুলহামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক বিরতির পর লিগে ফিরবে সিটি। এরপর ২৯ নভেম্বর সরাসরি মুখোমুখি হবে শীর্ষে থাকা আর্সেনালের। ফলে সামনের দুই ম্যাচই শিরোপার লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

-d522d4.webp)
