logo

হুমকি বাস্তবায়ন চীনের, সম্প্রচার থেকে ‘উধাও’ রিয়াল-এমবাপ্পে

হুমকি বাস্তবায়ন চীনের, সম্প্রচার থেকে ‘উধাও’ রিয়াল-এমবাপ্পে
কিলিয়ান এমবাপ্পে। ছবি: রিয়াল মাদ্রিদ

কিলিয়ান এমবাপ্পের মন্তব্য ঘিরে চীনে তৈরি হওয়া বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। ফরাসি তারকা, রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা কর্তৃপক্ষের ক্ষমা চাওয়ার পরও নিজেদের অবস্থান বদলায়নি চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। গত সোমবার স্প্যানিশ লিগের সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া সিসিটিভি এবার তা কার্যকর করেছে। শুক্রবার ও শনিবার লা লিগার কোনো ম্যাচই দেখায়নি তারা। অন্যদিকে দেশটির ডিজিটাল সম্প্রচারমাধ্যম মিগুর সূচিতে নেই রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ। এমনকি প্ল্যাটফর্মটিতে আগের ম্যাচগুলোর তালিকাতেও পাওয়া যাচ্ছে না স্প্যানিশ জায়ান্টদের।

রোববার (১ নভেম্বর) স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, এমবাপ্পের মন্তব্যের জেরে গত ২৬ অক্টোবর লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করেছিল চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি। এরপর শুক্রবার ও শনিবার অনুষ্ঠিত পাঁচটি ম্যাচের একটিও সম্প্রচার করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি রোববার ও সোমবারের নির্ধারিত ম্যাচগুলোও তাদের সম্প্রচারসূচিতে রাখা হয়নি।

শুক্রবার ও শনিবারের ম্যাচগুলোর মধ্যে ছিল ভিয়ারিয়াল-এস্পানিওল, লেভান্তে-আতলেতিকো মাদ্রিদ, রায়ো ভায়েকানো-সেল্তা ভিগো, রিয়াল বেতিস-মালাগা এবং বার্সেলোনা-আলাভেসের লড়াই। কিন্তু এসব ম্যাচের একটিও চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা যায়নি।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষেত্রে। রোববার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে লা লিগার ম্যাচ রয়েছে হোসে মরিনিওর দলের। কিন্তু চীনে লা লিগার একচেটিয়া ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব পাওয়া মিগুর সূচিতে নেই ম্যাচটি।

চলতি মৌসুম থেকে ২০২৯-৩০ মৌসুম পর্যন্ত চীনে লা লিগার ডিজিটাল সম্প্রচারের স্বত্ব রয়েছে মিগুর হাতে। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য সিসিটিভির মতো পুরো লিগের সম্প্রচার বন্ধ করেনি। সপ্তাহান্তের প্রায় সব ম্যাচই তাদের সূচিতে রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ।

ইএফইর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মিগুর প্ল্যাটফর্মে আগের ম্যাচগুলোর তালিকাতেও রিয়াল মাদ্রিদের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে না। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ম্যাচগুলোর তথ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অন্য দলগুলোর ম্যাচের ফল, হাইলাইটস কিংবা পুরো ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও রিয়ালের ম্যাচগুলো সেখানে নেই।

একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে সিসিটিভির মোবাইল অ্যাপেও। সেখানে সম্প্রচার স্থগিতের আগের কিছু ম্যাচের ভিডিও এখনো রয়েছে। সর্বশেষ ২৫ অক্টোবরের সেল্তা ভিগো-রিয়াল বেতিস ম্যাচটি পাওয়া যাচ্ছে। তবে চলতি কিংবা গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের খেলা কোনো ম্যাচের ভিডিও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ইএফই।

যদিও এসব ম্যাচের ভিডিও স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মিগুও রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ সূচিতে না থাকার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

বিতর্কের শুরু এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে নিজের পছন্দের একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংয়ের ছবি ব্যবহার করা একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবির প্রসঙ্গ তোলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। ছবিটিতে মাওয়ের মুখের জায়গায় এমবাপ্পের মুখ বসানো হয়েছিল।

ওই ছবি নিয়ে কথা বলার সময় একজন ‘চীনা স্বৈরশাসক’-এর উল্লেখ করেন এমবাপ্পে। তবে সরাসরি মাও সে-তুংয়ের নাম উচ্চারণ করেননি তিনি। তার সেই মন্তব্য চীনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠান। মেংনিউ, সাংহাই মিল্কগ্রাউন্ড ফুড টেক ও ইস্টরক বেভারেজ তার সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায়।

এরপর চীনা দর্শকদের কাছে ক্ষমা চান এমবাপ্পে। ফরাসি, চীনা ও ইংরেজি ভাষায় নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। লা লিগা কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। সংস্থাটির সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংকট মোকাবিলায় বিশেষ দলও গঠন করা হয়।

এমবাপ্পের মন্তব্যের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় রিয়াল মাদ্রিদও। ক্লাবটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চীন, দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।

তবে এসব পদক্ষেপের পরও সম্প্রচার স্বাভাবিক হয়নি। চায়না মিডিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, লা লিগার মাধ্যমে পাঠানো রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষমাপ্রার্থনার চিঠি তারা পেয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমা যথেষ্ট কি না কিংবা কবে থেকে আবার ম্যাচ সম্প্রচার শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এমবাপ্পের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করলেও সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হবে কি না, তা স্পষ্ট করেনি।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল বাজার। সেখানে সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে স্প্যানিশ ফুটবলের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এমবাপ্পের মন্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এখন আর শুধু তার ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নেই।

নুরসাদ আমিন

সম্পাদনা

নুরসাদ আমিন

স্পোর্টস রিপোর্টার | এশিয়া পোস্ট