ঢাকায় পাকিস্তানকে জবাব দিল ভারত

২৩ বছর আগে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল পাকিস্তান। ২০০৩ সালের সেই আসরে সরফরাজ রাসুলের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল তারা। দুই দশকের বেশি সময় পর আবারও ঢাকায় সাফের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এবারও শেষ মুহূর্তে নাটকীয়তা জমিয়েছিল পাকিস্তান। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেনি তারা। প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে যাওয়া ভারত যোগ করা সময়ে জোড়া গোল হজম করেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর এই জয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। ম্যাচের প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করেন ভারতের তরুণ ফরোয়ার্ড সুহাইল আহমদ ভাট। দলের অন্য গোলটি করেন মাংলেনথাং কিপগেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের হয়ে যোগ করা সময়ে গোল করেন নাজিব উল্লাহ ও আলমগির গাজি।
নিয়মিত জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে ছাড়াই সাফে অংশ নিচ্ছে ভারত। কোচ নওশাদ মুসার অধীনে তরুণদের নিয়ে গড়া দলটি অবশ্য মাঠে তার কোনো প্রভাব পড়তে দেয়নি। শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করে ভারতীয়রা।
ম্যাচের ১২তম মিনিটেই পাকিস্তানের জালে বল পাঠিয়েছিলেন সুহাইল আহমদ ভাট। তবে অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। যদিও গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে।
পরের মিনিটেই এগিয়ে যায় ভারত। বাঁ প্রান্তে থ্রো-ইন থেকে বল পেয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে যান মুহাম্মদ সুহাইল। এরপর বক্সে দুর্দান্ত একটি নিচু পাস বাড়ান তিনি। ছয় গজ বক্সের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া ভাট বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও পাকিস্তানের রক্ষণ ভেঙে দেন ভাট। ১৯তম মিনিটে অভিষেক সূর্যবংশীর বাড়ানো দুর্দান্ত থ্রু বল ধরে বক্সে ঢুকে পড়েন মোহনবাগানের এই ফুটবলার। এরপর ঠান্ডা মাথায় পাকিস্তানের গোলরক্ষক ইউসুফ বাটকে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি।
মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে পাকিস্তানকে বড় চাপে ফেলে দেয় ভারত। বিপরীতে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও আক্রমণে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না পাকিস্তান। ভারতের রক্ষণভাগও প্রতিপক্ষকে বিপজ্জনক জায়গায় বল নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল না।
৩১তম মিনিটে পাকিস্তানের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেন কিপগেন। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যান নওফাল। এরপর পাকিস্তানের রক্ষণ ভেদ করে কিপগেনকে পাস বাড়ান তিনি। বল পেয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে গোলরক্ষকের সঙ্গে একক লড়াইয়ে জাল খুঁজে নেন এই মিডফিল্ডার। তাতে ম্যাচের প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে যায় ভারত।
তবে তিন গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার বড় সুযোগ পেয়েছিল পাকিস্তান। ৩৫তম মিনিটে বক্সের ভেতরে মোহাম্মদ হাইয়ান খাট্টাককে ফাউল করেন ভারতের অভিষেক সূর্যবংশী। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।
স্পটকিক থেকে ব্যবধান কমানোর দায়িত্ব নেন শায়াক দোস্ত। কিন্তু তার শট ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে হতাশায় ডুবে যায় পাকিস্তান।
বিরতির ঠিক আগে নিজের হ্যাটট্রিক পূরণের আরেকটি সুযোগ পেয়েছিলেন ভাট। ৪৫তম মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে জোরালো শট নেন তিনি। কিন্তু বল অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে ৩-০ গোলের ব্যবধান নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আক্রমণের ধার ধরে রাখে ভারত। ব্যবধান আরও বাড়ানোর একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারেনি তারা। পাকিস্তানের গোলরক্ষক ইউসুফ বাটও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ প্রতিহত করেন।
অন্যদিকে তিন গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যায় পাকিস্তান। তবে ভারতের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পাচ্ছিল না তারা।
৬৩তম মিনিটে জোড়া পরিবর্তন আনেন ভারতীয় কোচ নওশাদ মুসা। দুই গোল করা ভাটের জায়গায় ফারুখ চৌধুরী এবং মুহাম্মদ সুহাইলের বদলে এবিন্দাস ইয়েসুদাসানকে মাঠে নামান তিনি। ৭১তম মিনিটে কিপগেনের জায়গায় নামানো হয় নাথান রদ্রিগেজকে।
এরপরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা ভারতের হাতেই ছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত ৩-০ গোলেই এগিয়ে থাকে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। তখন মনে হচ্ছিল, বড় ব্যবধানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে ভারত।
কিন্তু ম্যাচের আসল নাটকীয়তা অপেক্ষা করছিল যোগ করা সময়ে। ৯০ মিনিট পেরোনোর পর বাঁ প্রান্ত থেকে জুনাইদ শাহর বাড়ানো ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে ভারতের জালে বল পাঠান নাজিব উল্লাহ। তাতে ৯০+১ মিনিটে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-১।
এর মাত্র তিন মিনিট পরই দ্বিতীয় গোল পেয়ে যায় পাকিস্তান। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মিকেল আবদুল্লাহর বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দুর্দান্ত এক অ্যাক্রোবেটিক শটে ভারতীয় গোলরক্ষক আরশ আনোয়ার শেখকে পরাস্ত করেন আলমগির গাজি। মুহূর্তেই ব্যবধান কমে আসে এক গোলে।
ম্যাচজুড়ে তিন গোলে এগিয়ে থাকা ভারত তখন হঠাৎই সমতা ফেরার শঙ্কায় পড়ে যায়। শেষ কয়েক মুহূর্তে পাকিস্তানের আক্রমণ সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের রক্ষণও আগলে রাখতে হয় তাদের।
তবে বাকি সময় আর কোনো গোল করতে পারেনি পাকিস্তান। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ভারত। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত লড়াই করেও হার এড়াতে না পারার হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় পাকিস্তানকে।
এই জয়ে ‘বি’ গ্রুপে তিন পয়েন্ট নিয়ে সাফের শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করল নয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত। গ্রুপ পর্বে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ। আগামী ১১ নভেম্বর সেই ম্যাচে মাঠে নামবে নওশাদ মুসার দল। অন্যদিকে ৮ নভেম্বর মালদ্বীপের বিপক্ষে খেলবে পাকিস্তান।


