প্রচণ্ড গরমের ঝুঁকিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের এক-চতুর্থাংশ ম্যাচ

প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ, ১০৪ ম্যাচের দীর্ঘ সূচি, তিন দেশের ১৬ শহরজুড়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আয়োজন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে এবার বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে মাঠের ফুটবল নয়, মাঠ ও গ্যালারির তাপমাত্রা। নতুন এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় হতে যাওয়া বিশ্বকাপের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ম্যাচ বিপজ্জনক গরমের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১০৪ ম্যাচের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ ম্যাচ এমন পরিস্থিতিতে হতে পারে, যা ফুটবলারদের বৈশ্বিক সংগঠন ফিফপ্রোর সুপারিশ করা তাপ-নিরাপত্তা সীমা ছাড়িয়ে যাবে। গবেষকরা বলছেন, অন্তত পাঁচটি ম্যাচ এমন তাপমাত্রায় পড়তে পারে, যেখানে ম্যাচ স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
আলোচিত এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার বা ডব্লিউবিজিটি সূচক। শুধু বাতাসের তাপমাত্রা নয়, আর্দ্রতা, রোদ, বাতাসের গতি মিলিয়ে মানুষের শরীর নিজেকে কতটা ঠান্ডা রাখতে পারছে, সেটিই বোঝায় এই সূচক। ফিফপ্রোর সুপারিশ অনুযায়ী ডব্লিউবিজিটি ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে বাড়তি কুলিং ব্যবস্থা দরকার, আর ২৮ ডিগ্রি ছাড়ালে ম্যাচ স্থগিত করার কথা ভাবা উচিত। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ২৮ ডিগ্রি ডব্লিউবিজিটি প্রায় ৩৮ ডিগ্রি শুকনো গরম বা উচ্চ আর্দ্রতায় প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সমতুল্য হতে পারে।
ফিফা অবশ্য জানিয়েছে, তারা তাপ-ঝুঁকি মাথায় রেখে পরিকল্পনা করেছে। প্রতিটি অর্ধে তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি, খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য কুলিং ব্যবস্থা, কাজ ও বিশ্রামের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং বাস্তব সময়ের পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়তি চিকিৎসা প্রস্তুতির কথা বলেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, শুধু পানি-পানের বিরতি সব ঝুঁকি কমানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
ঝুঁকির বড় অংশ রয়েছে যেসব স্টেডিয়ামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ নেই, সেসব ভেন্যুতে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২৬ ডিগ্রি ডব্লিউবিজিটি ছাড়ানোর অন্তত ১০ শতাংশ ঝুঁকি আছে এমন ম্যাচের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে এয়ার কন্ডিশনিংবিহীন স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে রয়েছে মায়ামি, কানসাস সিটি, নিউইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়া। ফাইনালের ভেন্যু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেও ২৬ ডিগ্রি সীমা ছাড়ানোর ঝুঁকি প্রায় এক-আট ভাগ, আর বেশি বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোর ঝুঁকি প্রায় ৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চিকিৎসক ও গবেষক ক্রিস মুলিংটন বলেছেন, চরম গরম ম্যাচের ধরনও বদলে দিতে পারে। তার মতে, এলিট ফুটবলাররা শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে নিজেদের গতি কমিয়ে খেলতে পারেন। ফলে বিশ্বকাপে দেখা যেতে পারে তুলনামূলক ধীর, সতর্ক ও রক্ষণশীল ফুটবল।
দর্শকদের ঝুঁকিও আলাদা করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ডালাস, হিউস্টন বা আটলান্টার মতো কিছু ভেন্যুতে স্টেডিয়ামের ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকলেও বাইরে ফ্যান ফেস্ট, যাতায়াত ও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার মধ্যে দর্শকদের বড় অংশ গরমের সরাসরি প্রভাবে পড়তে পারেন। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও আগে থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা সমর্থকদের জন্য তা বেশি উদ্বেগের।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেছেন, ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ আয়োজনের সময়সূচি নিয়েও ফিফার নতুন করে ভাবা দরকার। তার মতে, গ্রীষ্মের মাঝামাঝি নয়, তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করলে সেটি খেলোয়াড়, দর্শক ও আয়োজক শহর সব পক্ষের জন্যই নিরাপদ হতে পারে।
