ব্যালন ডি’অর জিতলে কত টাকা পান ফুটবলাররা?

বিশ্বসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি, হাতে সোনালি ট্রফি। ব্যালন ডি’অর জেতা যেকোনো ফুটবলারের স্বপ্ন। কিন্তু এত বড় পুরস্কার জিতলে কত টাকা পান তারা? উত্তরটা কিছুটা অবাক করার মতো। ব্যালন ডি’অরজয়ীদের সরাসরি কোনো অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয় না। তবে ক্লাব ও স্পনসরদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোটি কোটি টাকা বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকে। শুধু তা-ই নয়, এই একটি অর্জন বদলে দিতে পারে একজন ফুটবলারের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হবে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসর। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোর ২টায় শুরু হবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এবারের পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও হ্যারি কেইন। তাদের মধ্যে যিনিই জিতুন না কেন, ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে তার সামনে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের আন্তর্জাতিক ফুটবল বিভাগের প্রধান আরিৎস গাবিলন্দো এক বিশ্লেষণে ব্যালন ডি’অরের এই বাণিজ্যিক দিকটি তুলে ধরেছেন। তার মতে, পুরস্কারটি এখন শুধু বিশ্বসেরা ফুটবলার নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খেলোয়াড়দের বাণিজ্যিক মূল্য, স্পনসরদের বিনিয়োগ এবং ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিপুল ব্যবসার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
এএসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যালন ডি’অরের সোনালি ট্রফিটির আনুমানিক মূল্য সাড়ে তিন হাজার ইউরো। তবে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত বাজারমূল্য নয়। ট্রফিটির প্রকৃত গুরুত্বও সেই অর্থমূল্যে নয়। কারণ এটি জিতলে একজন ফুটবলারের সামনে যে আর্থিক সুযোগ তৈরি হতে পারে, তার পরিমাণ অনেক বেশি।
ফুটবলারদের অনেক চুক্তিতেই ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য বিশেষ বোনাসের শর্ত থাকে। ব্যালন ডি’অর জিতলে সেসব শর্ত অনুযায়ী বিপুল অর্থ পেতে পারেন তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বোনাসের পরিমাণ ৩০ লাখ ইউরো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ নেইমার। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে (পিএসজি) যোগ দেওয়ার পর ব্রাজিলিয়ান তারকার চুক্তিতে ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ইউরো বোনাসের শর্ত থাকার খবর প্রকাশ করেছিল ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়েন। পরে লেকিপও সেই তথ্য জানায়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, নেইমার যতবার ব্যালন ডি’অর জিততেন, ততবারই ওই বোনাস পাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে পিএসজির হয়ে কখনো পুরস্কারটি জেতা হয়নি তার। ফলে সেই বোনাসও পাননি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
শুধু ক্লাবের চুক্তিই নয়, ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্পনসরদের সঙ্গেও ফুটবলারদের চুক্তিতে এমন বোনাস থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের পর নাইকির সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রায় আট লাখ ইউরো বোনাস পাওয়ার কথা ছিল লুকা মদ্রিচের। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল কনফিদেনসিয়াল সে সময় জানিয়েছিল, ব্যক্তিগত অর্জনের ভিত্তিতে তার চুক্তির কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়ায় এই অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
মদ্রিচের ব্যালন ডি’অর জয়কে বাণিজ্যিকভাবেও কাজে লাগিয়েছিল নাইকি। ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারের অর্জন উদ্যাপন করতে বিশেষ সংস্করণের ফুটবল বুট বাজারে এনেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ফলে পুরস্কারটি শুধু খেলোয়াড়ের জন্য নয়, তার স্পনসরের জন্যও ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল।
তবে ব্যালন ডি’অর জয়ের আর্থিক সুবিধা কেবল এককালীন বোনাসে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি একজন তারকার বিজ্ঞাপনমূল্যও বাড়িয়ে দিতে পারে। নতুন স্পনসর পাওয়া, পুরোনো চুক্তি নবায়নের সময় বাড়তি অর্থ দাবি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের পরিচিতি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়।
এই জায়গায় লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উদাহরণ টেনেছেন গাবিলন্দো। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুই তারকায় পরিণত হয়েছেন তারা। মাঠের অসাধারণ সাফল্যের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমেও বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন দুজন।
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসি এবং পাঁচবারের বিজয়ী রোনালদো এমন এক বাণিজ্যিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যেখানে তাদের জনপ্রিয়তা ফুটবল মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ক্রীড়াসামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে নিয়মিত দেখা যায় তাঁদের।
এএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেসি-রোনালদোর তৈরি করা সেই অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ রয়েছে এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো পরবর্তী প্রজন্মের তারকাদের সামনে। মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক বাজারেও বড় জায়গা তৈরি করতে পারেন তারা।
এবারের ব্যালন ডি’অর নিয়ে দুই তারকার আত্মবিশ্বাসও আলোচনায় এসেছে। নিজেদের সাফল্য ও পুরস্কার জয়ের যোগ্যতা নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন তারা। গাবিলন্দোর মতে, মেসি-রোনালদো যুগের পর ফুটবলের বাণিজ্যিক নেতৃত্বও হাতবদলের অপেক্ষায়। সেই জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় আছেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।
অবশ্য ব্যালন ডি’অর ঘিরে এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার সমালোচনাও রয়েছে। পিএসজির কোচ লুইস এনরিকের মতো অনেকে ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। তার মতে, ফুটবল দলীয় খেলা এবং একজনের ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে পুরো দলের সাফল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সমালোচনা থাকলেও ব্যালন ডি’অরের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে পুরস্কারটির বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বেড়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছিল বিশ্বের ১০৫টি দেশে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৈরি হয়েছিল বিপুল সাড়া।
ফলে ব্যালন ডি’অর এখন কেবল একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুও। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এবারের ব্যালন ডি’অর কার হাতে উঠবে, তা জানতে আর কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। তবে বিজয়ী যিনিই হোন, আয়োজকদের কাছ থেকে কোনো নগদ অর্থ পাবেন না তিনি। তার আর্থিক লাভের পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যক্তিগত চুক্তির শর্ত ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সুযোগের ওপর। সোনালি ট্রফিটির চেয়ে তাই সেটি জয়ের আর্থিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।



