মাও সে-তুং বিতর্কে বড় বিপাকে এমবাপ্পে

একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে মন্তব্যের জেরে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। চীনের সাবেক নেতা মাও সে-তুংকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগে দেশটিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরাসি তারকা। এরই মধ্যে তার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে চীনের তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান। বিতর্কের প্রভাব পড়েছে স্প্যানিশ ফুটবলেও। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করেছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এপি ও এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিতর্কের সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও থেকে। ফরাসি ফুটবলার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনির অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠান 'দ্য ব্রিজ'-কে ঘিরে ক্লিপটি সামনে আসে। সেখানে এমবাপ্পেকে তার সবচেয়ে পছন্দের ইন্টারনেট মিম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে দেখা যায়।
জবাবে তিনি এমন একটি মিমের কথা বলেন, যেখানে তার মুখ বসানো হয়েছে এক ব্যক্তির ছবিতে, যাকে তিনি চীনের একজন স্বৈরশাসক বলে মনে করেন। ভিডিওতে এরপর মাও সে-তুংয়ের শরীরে এমবাপ্পের মুখ বসানো একটি সম্পাদিত ছবি দেখানো হয়। তবে ফরাসি ফরোয়ার্ড সরাসরি মাওয়ের নাম উল্লেখ করেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই এমবাপ্পেকে নিয়ে বিভিন্ন মিম তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে তাকে বিভিন্ন দেশের সাবেক কর্তৃত্ববাদী শাসকের বেশে দেখানো হয়েছে। মূলত এমন একটি মিম নিয়েই মন্তব্যটি করেছেন বলে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি এএফপির তথ্য যাচাই বিভাগ। ফলে এমবাপ্পে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে মন্তব্যটি করেছেন, সেটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এখনো স্পষ্ট নয়।
এর মধ্যেই চীনে ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সে-তুংকে নিয়ে এমন মন্তব্যকে অসম্মানজনক হিসেবে দেখছেন অনেকে। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন মাও। চীনে তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে এমবাপ্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন ব্যবহারকারীরা। তাকে বয়কটের দাবিও ওঠে। চীনের জনপ্রিয় ফুটবলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ডংচিউদি এক বিবৃতিতে মন্তব্যটিকে অনুপযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, এটি চীনা ফুটবলপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
বিতর্কের মধ্যেই এমবাপ্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান। প্রথমে পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ডংপেং জানায়, ফরাসি তারকার সঙ্গে তাদের সব ধরনের বাণিজ্যিক সহযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো আচরণ তারা সমর্থন করে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের শূন্য সহনশীলতার নীতি রয়েছে।
একই পথে হাঁটে চীনের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বক্তব্য বা আচরণের বিরোধিতা করে তারা। ফলে এমবাপ্পের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরে চিজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মিল্কগ্রাউন্ডও ফরাসি তারকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানই এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নির্দিষ্ট করে ভাইরাল ভিডিওটির কথা উল্লেখ করা হয়নি।
চীনের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত মুখ এমবাপ্পে। দেশটির বিভিন্ন শহরের বাসস্ট্যান্ড, পাতালরেল স্টেশন থেকে শুরু করে বিপণিবিতান ও লিফটের বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে তাঁকে। ডংপেংয়ের একটি বিজ্ঞাপনে চীনা ভাষায় প্রতিষ্ঠানের প্রচারমূলক বক্তব্যও দিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে মেংনিউয়ের বিজ্ঞাপনে আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির সঙ্গেও দেখা গেছে ফরাসি ফরোয়ার্ডকে।
বিতর্কের প্রভাব কেবল এমবাপ্পের ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। চীনা সংবাদমাধ্যম দ্য পেপার জানিয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি সোমবার রাত থেকে লা লিগা ও এমবাপ্পেসংশ্লিষ্ট ম্যাচের সম্প্রচার স্থগিত করেছে।
দ্য পেপারের প্রতিবেদনে সিসিটিভিসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এমবাপ্পেকে নিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন ও প্রচারমূলক ভিডিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।
তবে সিসিটিভির সিদ্ধান্তের অর্থ চীনের সব সম্প্রচারমাধ্যমে লা লিগার খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। অন্য টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর সম্প্রচারে এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিতর্কের মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চীনের ফুটবলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ডংচিউদিও। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং প্রকাশ করতে গিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা এমবাপ্পের নামই সরিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সেখানে তার নামের পরিবর্তে চীনা ভাষায় এমন একটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ 'এমন কোনো ব্যক্তি নেই'। একই সঙ্গে ফরাসি তারকার একটি সাদাকালো ছবিও প্রকাশ করেছে প্ল্যাটফর্মটি।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মঙ্গলবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এএফপির এক সাংবাদিক এমবাপ্পের বিতর্কিত ভিডিও ও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি বাতিলের বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলো দেখেছি। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা ও কাজ স্বাভাবিকভাবেই চীনা সমাজের সব অংশের সম্মিলিত বিরোধিতার মুখে পড়বে।’
অন্যদিকে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডনোট জানিয়েছে, এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের কনটেন্ট-সংক্রান্ত চুক্তি আগেই শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমান বিতর্কের কারণে সেটি বাতিল হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সাম্প্রতিক ঘটনার পর এমবাপ্পেকে নিয়ে তৈরি প্রচারমূলক উপকরণ সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিতর্কের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকারও। সেখানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার মুখ বসিয়ে তৈরি মিম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল।
তখন এমবাপ্পে জানিয়েছিলেন, এ ধরনের কিছু ছবি তার কাছে মজার মনে হলেও সবগুলো নয়। ইতিহাসে বহু মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছেন, এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের তুলনা পছন্দ করেন না তিনি।
ফরাসি তারকা বলেছিলেন, ‘এর কিছু অংশ মজার, কারণ বোঝা যায়, অনেকে নিছক রসিকতা করতেই এসব তৈরি করেন। কিন্তু আরেকটি দিক ততটা মজার নয়। কারণ ইতিহাসে এ ধরনের মানুষের কর্মকাণ্ডে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা জানি।’
এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের তুলনা নিয়ে অস্বস্তির কথাও জানিয়েছিলেন এমবাপ্পে। তার মতে, অনেক সময় এসব মিমের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাব প্রকাশ পায়।
সেপ্টেম্বরের সেই বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ভিডিওতে প্রচারিত মন্তব্যের পার্থক্য নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে ভাইরাল ক্লিপটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় এমবাপ্পের অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এপিও জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে এমবাপ্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এমন সময় এই বিতর্কে জড়ালেন এমবাপ্পে, যখন ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়েও হতাশ হতে হয়েছে তাকে। সোমবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত এবারের ব্যালন ডি’অরের আসরে হ্যারি কেইনের কাছে হেরে দ্বিতীয় হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
ব্যালন ডি’অর হাতছাড়া হওয়ার পরদিনই চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক বাজারে একাধিক পৃষ্ঠপোষক হারালেন এমবাপ্পে। তবে চুক্তি বাতিলের ফলে তাঁর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিতর্ক নিয়ে এমবাপ্পে কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার দিকেই এখন নজর থাকছে।


