বিশ্বকাপের ঘাস নিয়েই বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ ‘সাধনা’

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই মাঠজুড়ে তারকাদের নৈপুণ্য, গ্যালারিতে দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর কোটি মানুষের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। তবে এবার ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের মাঠের পেছনের গল্পটা একটু ভিন্ন এবং চমকপ্রদ। সাধারণত ফুটবলপ্রেমীরা মাঠের খেলোয়াড়দের দিকে চোখ রাখলেও, এবার মূল আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে খেলোয়াড়দের পায়ের নিচের সবুজ ঘাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের ঘাসের মান বলের গতি, নিয়ন্ত্রণ ও পাসিংয়ের মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া মাঠে কোনো ত্রুটি থাকলে খেলোয়াড়দের ইনজুরির শঙ্কাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ বিশ্বকাপকে নিখুঁত করতে বিগত আট বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন একদল বিজ্ঞানী ও টার্ফ বিশেষজ্ঞ।

এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি ঘাস তৈরি করা, যা বিভিন্ন আবহাওয়ায় সমানভাবে কার্যকর থাকবে এবং ম্যাচের সময় মাঠকে স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাখবে। বিশেষ করে ডোম স্টেডিয়ামগুলোতে সূর্যের আলো না পৌঁছানোর কারণে ঘাস টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ও কানাডার ম্যাচে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার একটি সহজ সুযোগ নষ্ট হওয়ার পর মাঠের মান নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়। সেই ম্যাচে আগে কৃত্রিম টার্ফ থাকা সত্ত্বেও টুর্নামেন্টের জন্য দ্রুত প্রাকৃতিক ঘাস বসানো হয়েছিল। পরে খেলোয়াড়রা অভিযোগ করেন, মাঠের ঘাস বলের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করেছিল এবং আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। সেই ঘটনাই নতুন করে ঘাস গবেষণার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি স্টেডিয়ামে আলাদা আলাদা ঘাস ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুরো প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন সোরোচান। তার মতে, ঘাসের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সূর্যালোক অপরিহার্য হলেও ডোম স্টেডিয়ামে সেই আলো না থাকায় কৃত্রিম প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

গত আট বছরের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৭০টিরও বেশি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। ছোট আকারের পরীক্ষামূলক মাঠে ফুটবল ফেলে বলের গতি, বাউন্স এবং নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের বুটের চাপ অনুকরণ করে দেখা হয়েছে ঘাস কতটা টেকসই থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কয়েক মিলিমিটার ঘাসের উচ্চতার পরিবর্তনও পুরো মাঠের আচরণ বদলে দিতে পারে।
আবহাওয়ার ভিন্নতার কারণে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা ধরনের ঘাস নির্বাচন করা হয়েছে। গরম অঞ্চলের স্টেডিয়ামে ব্যবহার করা হবে বারমুডা ঘাস। শীতল অঞ্চলের জন্য রাখা হয়েছে কেন্টাকি ব্লুগ্রাস এবং পেরেনিয়াল রাইগ্রাসের মিশ্রণ। কিছু মাঠে ঘাসকে আরও শক্ত ও স্থিতিশীল করতে কৃত্রিম ফাইবারও যুক্ত করা হচ্ছে।
ঘাস উৎপাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে তৈরি করা হয়েছে বিশাল টার্ফ ফার্ম। সেখানে শত শত একর জমিতে বিশেষ যত্নে ঘাস চাষ করা হচ্ছে। নিয়মিত পানি, সার, পুষ্টি উপাদান প্রয়োগের পাশাপাশি সামুদ্রিক শৈবাল ও সিলিকা ব্যবহার করা হচ্ছে ঘাসকে আরও শক্তিশালী করতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় দশ দিন আগে এই ঘাস কেটে রোল আকারে স্টেডিয়ামে পাঠানো হবে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঘাস নিয়ে এই গবেষণা ও প্রস্তুতিতেই ইতোমধ্যে ৫০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। আয়োজকদের আশা, এই বিস্তৃত পরিকল্পনার ফলে আগের বড় টুর্নামেন্টগুলোর মতো মাঠের মান নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হবে না।
সূত্র: বিবিসি


