মেইড বাই বাংলাদেশ: কনভে যেভাবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নাম লিখছে

মেইড বাই বাংলাদেশ: কনভে যেভাবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নাম লিখছে
ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের দেশি প্ল্যাটফর্ম কনভে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিশ্বজুড়ে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের বাজার দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বিদেশি প্ল্যাটফর্মের দখলে—জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিমস। অথচ গত কয়েক বছরে এই বাজারের একটি কোণে নিঃশব্দে জায়গা করে নিয়েছে ঢাকায় তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম: কনভে।

Advertisement

আজ এটি কেবল একটি দেশীয় বিকল্প নয়; দক্ষিণ আফ্রিকায় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন থেকে শুরু করে দেশের আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রকের গণশুনানি পর্যন্ত বড় বড় মঞ্চে ব্যবহৃত হচ্ছে কনভে।

কনভে কী, এবং কীভাবে এর শুরু

কনভে ঢাকাভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটির তৈরি একটি ‘এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড’ ভিডিও কনফারেন্সিং ও কোলাবোরেশন প্ল্যাটফর্ম। কৌতূহলোদ্দীপক হলো এর জন্মকথা। কোভিড-১৯ মহামারির আগে এটি ছিল সিনেসিস আইটির নিজস্ব অফিস-সভা পরিচালনার একটি অভ্যন্তরীণ টুল। ধীরে ধীরে তা একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিফায়েড কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয় এবং ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়।

বুয়েটসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রকৌশলীদের গড়া এই প্ল্যাটফর্মটি এখন প্রায় ৫০ জন প্রকৌশলীর একটি দল রক্ষণাবেক্ষণ করছে, আর এটি ব্যবহৃত হচ্ছে ৪৫টিরও বেশি দেশে। সিনেসিস আইটির চিফ সলিউশন অফিসার আমিনুল বারি শুভ্রর ভাষ্যে, কনভে এমন এক উদ্যোগ যেখানে উদ্ভাবন পশ্চিম থেকে পূর্বে নয়, বরং পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাচ্ছে—অর্থাৎ বাংলাদেশ এখানে গ্রাহক নয়, উদ্ভাবক।

ফিচার ও ফাংশনালিটি: তিন স্তম্ভে গড়া এক প্ল্যাটফর্ম

কনভে নিজেকে উপস্থাপন করে ‘সরকার, শিক্ষা ও এন্টারপ্রাইজের জন্য নিরাপদ, সার্বভৌম ও এআই-চালিত সহযোগী’ হিসেবে। এর সক্ষমতা মোটা দাগে তিনটি স্তম্ভে ভাগ করা যায়।

এক. ইউনিফায়েড কমিউনিকেশন

এটি কেবল মিটিং অ্যাপ নয়—কল, সভা, মেসেজিং ও ফাইল শেয়ারিং এক জায়গায়। এর মধ্যে রয়েছে এক ক্লিকে এইচডি ভিডিও কনফারেন্সিং; ‘বিগ মিটিং’, যেখানে একসঙ্গে ১০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী নিয়ে স্থিতিশীলভাবে সভা বা ওয়েবিনার পরিচালনা করা যায়; চ্যানেলভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড টিম চ্যাট; নিরাপদ ফাইল শেয়ারিং ও ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট; ওয়ান-টু-ওয়ান ও গ্রুপ কল; সভা থেকে সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিং; এবং সম্মেলনকক্ষকে ডিজিটাল মিটিং স্পেসে রূপান্তরের ‘কনভে রুম’।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এর স্বল্প-ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা। অ্যাডাপ্টিভ বিটরেট স্ট্রিমিং, ইন্টেলিজেন্ট অডিও প্রায়োরিটাইজেশন ও ব্যান্ডউইথ-সচেতন প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্বল বা অস্থিতিশীল ইন্টারনেটেও এটি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে; যা উন্নয়নশীল অঞ্চলের জন্য সিদ্ধান্তমূলক পার্থক্য তৈরি করে। প্ল্যাটফর্মটি উইন্ডোজ, ম্যাকওএস, অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসে (ওয়েব ও মোবাইল) উভয় মাধ্যমেই চলে।

দুই. কনভে এআই স্যুট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কনভে'র অন্যতম স্বতন্ত্র দিক। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় মিটিং মিনিটস (গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ সারাংশ), একাধিক ভাষায় নির্ভুল রিয়েল-টাইম এআই ট্রান্সক্রিপশন, আলোচনা থেকে করণীয় কাজ আলাদা করার ‘অ্যাকশন আইটেম এক্সট্রাকশন’, লাইভ কথোপকথন-ক্যাপশন-চ্যাটে বহুভাষিক সমর্থন, রিয়েল-টাইম সাবটাইটেল এবং সশরীরে সভার জন্য ‘ইন-পারসন মিটিং অটোমেশন’ যেখানে কনভে নিজেই বক্তা শনাক্ত করে ট্রান্সক্রিপ্ট ও মিনিটস তৈরি করে দেয়।

ট্রান্সক্রিপশন ইংরেজি ও বাংলার পাশাপাশি ফরাসি, পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ভাষা সমর্থন করে; স্পিকার আইডেন্টিফিকেশন রয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে। প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যমতে রিয়েল-টাইম ট্রান্সক্রিপশনে এর নির্ভুলতা প্রায় ৯৩ শতাংশ, আর বাংলার আঞ্চলিক উচ্চারণ পুরোপুরি বুঝতে কাজ চলমান। উল্লেখযোগ্য, ট্রান্সক্রিপশন সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও মিটিং মিনিটসের মতো উন্নত ফিচার মূলত প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন ও বিটুবি মডেলে দেওয়া হয়।

তিন. এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব

এখানেই কনভে'র সবচেয়ে বড় কৌশলগত বাজি। ভোক্তা-কেন্দ্রিক অ্যাপের বিপরীতে এটি গড়া হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য যারা তথ্য-সার্বভৌমত্ব ও সম্মতিতে আপস করে না। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব (তথ্য নিজস্ব আইনি এখতিয়ারের ভেতরে, কোনো তৃতীয় পক্ষের অ্যাক্সেস ছাড়া), অডিট ট্রেইল-ওয়াটারমার্ক-সোর্স ট্র্যাকিংসহ ‘কনফিডেনশিয়ালিটি চেইন’, অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড এনক্রিপশন ও এইএস-২৫৬, ভূমিকা-ভিত্তিক গ্রানুলার অ্যাডমিন কন্ট্রোল ও আরবিএসি, এবং এসএসও/এলডিএপি-ভিত্তিক সিকিউর প্রভিশনিং।

অন-প্রিমিস, ন্যাশনাল ক্লাউড কিংবা হাইব্রিড তিন ধরনের ডিপ্লয়মেন্ট, সঙ্গে এয়ার-গ্যাপ ও ডোমেইন/কান্ট্রি লক সব মিলিয়ে এটি প্রতিরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও ব্যাংকিংয়ের মতো স্পর্শকাতর খাতের উপযোগী।

এই সক্ষমতার ওপর ভর করে কনভে ছয়টি খাতের জন্য আলাদা সমাধান দেয়: সরকার, এন্টারপ্রাইজ ও করপোরেট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা, এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

জুম, মিট বা টিমস থেকে কনভে কেন আলাদা

জনপ্রিয় বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের সহজতায় এগিয়ে, কিন্তু কনভে যে জায়গাগুলোয় ভিন্ন পথ ধরেছে, সেগুলো সরকার ও নিয়ন্ত্রিত খাতের কাছে নির্ণায়ক। যেমন তথ্য-সার্বভৌমত্ব ও ডেটা রেসিডেন্সি। জুম বা গুগল মিটে তথ্য সাধারণত বিদেশি ক্লাউডে থাকে; কনভে অন-প্রিমিস বা জাতীয় ক্লাউডে চালানো যায়, ফলে তথ্য দেশের সীমানার ভেতরে ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এয়ার-গ্যাপ ও কান্ট্রি লক: ইন্টারনেট-বিচ্ছিন্ন বা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ পরিবেশে চলার সক্ষমতা, যা মূলধারার বিদেশি অ্যাপে সচরাচর মেলে না।

স্বল্প-ব্যান্ডউইথে নির্ভরযোগ্যা: যেখানে অনেক বিদেশি টুল দুর্বল সংযোগে ভেঙে পড়ে, কনভে সেই বাস্তবতাকেই ভিত্তি ধরে তৈরি।

কনভে
কনভে

বাংলা ও বহুভাষিক এআই: বাংলা-থেকে-বাংলা স্পিচ-টু-টেক্সট ও স্থানীয় ভাষার ট্রান্সক্রিপশন, যা স্থানীয় সরকারি ব্যবহারে অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়।

গোপনীয়তা-কেন্দ্রিক এআই ও জবাবদিহিতা: ওয়াটারমার্ক, সোর্স ট্র্যাকিং ও অডিট ট্রেইলসহ কনফিডেনশিয়ালিটি চেইন, যেখানে এআই সুবিধা দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে।

সারকথা এই যে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো সভাকে সহজ করে; কনভে সেই সহজতার সঙ্গে যোগ করে সার্বভৌমত্ব, শাসন-নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যের ওপর পূর্ণ অধিকার।

বিশ্ববাজারে একটি বাংলাদেশি সফটওয়্যারের অবস্থান কেন জরুরি

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত বহু বছর ধরে মূলত সেবা-রপ্তানি ও আউটসোর্সিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু একটি নিজস্ব পণ্য বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ভিন্ন মাত্রার অর্জন এবং এটি কয়েকটি কারণে দেশের জন্য জরুরি।

প্রথমত, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। সরকারি ও স্পর্শকাতর যোগাযোগ যখন বিদেশি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল, তখন তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকে যায়। কনভের মতো দেশীয় সমাধান এই নির্ভরতা কমায়।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মূল্য। সফটওয়্যার লাইসেন্স ও সাবস্ক্রিপশন বাবদ যে অর্থ বিদেশে যেত, পণ্য-রপ্তানির মাধ্যমে তা উল্টো দেশে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, ব্র্যান্ড ও আত্মবিশ্বাস। একটি বাংলাদেশি পণ্য বিশ্বমঞ্চে বিদেশি জায়ান্টদের পেছনে ফেলে নির্বাচিত হলে তা পুরো খাতের ভাবমূর্তি বদলে দেয় এবং তরুণ উদ্যোক্তা-প্রকৌশলীদের সামনে নতুন দিগন্ত খোলে।

কনভে ঠিক এই কাজটিই করছে—স্থানীয় বাস্তবতার (দুর্বল ইন্টারনেট, বাংলা ভাষা, তথ্য-নিয়ন্ত্রণের চাহিদা) সমাধানকে বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক পণ্যে রূপান্তরিত করে। এটি ‘পশ্চিম থেকে আমদানি’-র চেনা ছক উল্টে দিয়ে দেখাচ্ছে, উদ্ভাবন পূর্ব থেকেও পশ্চিমে যেতে পারে।

আফ্রিকা ও এশিয়ার বাজারে জায়গা, আর জি-২০-র মঞ্চ

কনভে এখন আফ্রিকা ও এশিয়ার বাজারে ক্রমে পরিচিতি পাচ্ছে, আর এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে দৃশ্যমান মাইলফলক ছিল ২০২৫ সালের জি-২০-সংশ্লিষ্ট আয়োজন। ২০২৫ সালের ২৬ থেকে ২৭ মে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ‘সাসটেইনেবল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট সিম্পোজিয়াম ফর আফ্রিকা’-এর অফিসিয়াল ভিডিও কনফারেন্সিং ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নির্বাচিত হয় কনভে।

জুম, গুগল মিট ও মাইক্রোসফট টিমসের মতো প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে এই গৌরব অর্জন করে কনভে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, চীন, ব্রাজিল ও সৌদি আরবসহ ২৭টি দেশের মন্ত্রী, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এটিই ছিল প্রথমবার, যখন একটি বাংলাদেশি ডিজিটাল পণ্য এই মাপের কূটনৈতিক আলোচনায় কারিগরি ভিত্তি জুগিয়েছে। বিভিন্ন নেটওয়ার্ক-পরিস্থিতি থেকে যুক্ত হওয়া অংশগ্রহণকারীদের জন্য কনভে পাঁচ ভাষায় রিয়েল-টাইম ট্রান্সক্রিপশন, কাঠামোবদ্ধ ডকুমেন্টেশন ও নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে কনভে: একসঙ্গে ৫০০ প্রতিনিধি

কনভে'র সক্ষমতার সবচেয়ে প্রমাণ মিলেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলনে। রাজধানীর পরিকল্পনা বিভাগে আয়োজিত হাইব্রিড ধরনের এই সম্মেলনে কনভে'র ‘বিগ মিটিং’ ফিচার ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি একসঙ্গে ভার্চুয়াল সেশনে সরাসরি যুক্ত হন, কোনো প্রযুক্তিগত বিঘ্ন ছাড়াই। এত বড় পরিসরের একটি সম্মেলন একটি দেশীয় প্ল্যাটফর্মে এমন মসৃণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় আয়োজকেরা অভিভূত হন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ দেশ-বিদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল। অংশ নেন নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা এবং ইউএনডিপি, জিসিএফ, সিভিএফ, ভি২০, আইআইএক্স, এফসিবিও ও জিএ ক্যাপিটালের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। অংশগ্রহণকারীরা ডেস্কটপ, আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড—সব মাধ্যম থেকেই যুক্ত হন; অনেকের অভিজ্ঞতা ছিল, জুমে এত বড় সভা তাঁরা করেননি, আর কনভের মতো এমন মসৃণ প্ল্যাটফর্মও আগে পাননি।

এই সম্মেলন ছিল একটি বৃহত্তর জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিরই অংশ। ‘ইন্ট্রোডাকশন টু ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্টস ফর ক্লাইমেট ফাইন্যান্স’ শীর্ষক এই কর্মসূচির অনলাইন টেকনোলজি পার্টনার কনভে। মোট এক হাজার অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে তিন ধাপে পরিচালিত এই কর্মসূচির প্রথম দুটি ধাপ—প্রথমে ১১টি মূল্যায়নভিত্তিক সেশন ও পরে ২২টি গভীরতর সেশন—সম্পূর্ণভাবে কনভে প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে পরিচালিত হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা একে দেশের জন্য বৈশ্বিক মানের সক্ষমতা অর্জনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সিনেসিস আইটি'র চিফ বিজনেস অফিসার এ এস এম নুরুন নবীর ভাষ্যে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে দেশের তৈরি পণ্য কনভেতে আস্থা রাখাই বাংলাদেশ থেকে সত্যিকারের বৈশ্বিক পণ্য তৈরিতে তাদের অনুপ্রেরণা। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, পাঁচ শতাধিক অংশগ্রহণকারীর সভা এমন মসৃণ ও বিঘ্নহীন রাখার অভিজ্ঞতা বিশ্বের হাতে গোনা দু-একটি পণ্যের আছে—কনভে এখন সেই জায়গাটিই দাবি করছে।

বড় ইভেন্টে কনভে: বিটিআরসি গণশুনানি ও সরকারি প্রশিক্ষণ

দেশীয় সরকারি প্রক্রিয়াতেও কনভে এখন কার্যকর অবকাঠামো। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রথমবারের মতো তাদের জাতীয় গণশুনানি সম্পূর্ণভাবে কনভে'র মাধ্যমে পরিচালনা করে। ঢাকায় বিটিআরসি সদর দপ্তর থেকে সম্প্রচারিত ষষ্ঠ বার্ষিক এই শুনানিতে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে অংশগ্রহণকারীরা রাজধানীতে না এসেই যুক্ত হতে পারেন।

নাগরিকেরা মোবাইল নেটওয়ার্কের মান, কল ড্রপ, ইন্টারনেট গতি, ডেটার দাম ও গ্রামীণ-শহুরে নেটওয়ার্ক বৈষম্যের মতো বিষয়ে অভিযোগ তোলেন, আর বিটিআরসি প্রতিনিধিরা সরাসরি জবাব দেন; সব মন্তব্য ভবিষ্যৎ নীতির জন্য নথিভুক্ত হয়।

কর্মকর্তাদের মতে পুরো সময় কনভে স্থিতিশীল অডিও-ভিডিও মানে চলেছে—স্পিকার ব্যবস্থাপনা, মাইক্রোফোন নিয়ন্ত্রণ, কিউইং, সময় ব্যবস্থাপনা, স্ক্রিন শেয়ারিং ও সেশন রেকর্ডিং সবই মসৃণভাবে সামলেছে। এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেটেড ও রোল-ভিত্তিক অ্যাক্সেস-নিয়ন্ত্রিত এই প্ল্যাটফর্মে সব তথ্য সংরক্ষিত হয় নিরাপদ স্থানীয় অবকাঠামোয়।

নীতিনির্ধারকেরা একে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরামর্শের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারী একসঙ্গে ধারণের সক্ষমতা থাকায় কনভে ইতিমধ্যে জি-২০-সংশ্লিষ্ট ভার্চুয়াল বৈঠক ও বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ একাধিক বড় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে।

‘মেইড বাই বাংলাদেশ’-এর অগ্রযাত্রায় কেন কনভে মাইলফলক

বাংলাদেশের প্রযুক্তি-গল্প এতদিন মূলত শ্রম ও সেবা রপ্তানির গল্প। কনভে সেই গল্পে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করছে, নিজস্ব মেধাস্বত্বের একটি পণ্য, যা বিশ্বমঞ্চে বিদেশি জায়ান্টদের প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। দুর্বল ইন্টারনেট, বাংলা ভাষা কিংবা তথ্য-সার্বভৌমত্বের মতো ‘স্থানীয়’ চ্যালেঞ্জকে বৈশ্বিক সমাধানে রূপান্তরিত করে কনভে দেখিয়ে দিচ্ছে, ‘মেইড বাই বাংলাদেশ’ তকমা এখন আর কেবল পোশাকের নয়, বিশ্বমানের ডিজিটাল প্রযুক্তিরও পরিচয়। ঠিক এ কারণেই কনভে কেবল একটি সফল পণ্য নয়; দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার একটি প্রতীকী মাইলফলক।