logo

মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহে জাপানের মহাকাশ অভিযান

এএফপি
এএফপি
মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহে জাপানের মহাকাশ অভিযান
মানববিহীন ‘মার্সিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) প্রোব বহনকারী এইচ৩ রকেটটি ভোর ৪:৪১ মিনিটে (সোমবার ১৯:৪১ জিএমটি) তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

জাপানের বিজ্ঞানীরা মঙ্গলবার এমন একটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে, যার লক্ষ্য মঙ্গলের দুই উপগ্রহের একটি থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। সফল হলে এই অভিযান সৌরজগতের উৎপত্তি এবং পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) জানিয়েছে, দেশটির তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় সোমবার রাত ৭টা ৪১ মিনিট) এইচ৩ রকেটে করে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে মনুষ্যবিহীন ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) মহাকাশযান।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি আগামী বছরের আগস্টের দিকে মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছাবে। এরপর এটি মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে অবস্থান করবে।

পরবর্তী পর্যায়ে ফোবোসের পৃষ্ঠে অবতরণ করে সেখান থেকে অন্তত ১০ গ্রাম নমুনা সংগ্রহ করবে মহাকাশযানটি। মঙ্গলের আশপাশে প্রায় তিন বছর অবস্থান করে অভিযান শেষে নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই অভিযানকে মঙ্গল অঞ্চলে প্রথমবারের মতো যাত্রা শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মহাকাশ সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করছে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের আশা, এ অভিযান ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের অভিযানের পথও সুগম করবে।

মঙ্গলের উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে রহস্য

জাক্সার অন্যতম লক্ষ্য হলো মঙ্গল ও এর দুই উপগ্রহ ফোবোস এবং ডেইমোস কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। সৌরজগতের জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পেতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে। প্রথমটি ‘দৈত্যাকার সংঘর্ষ’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে মঙ্গলের সংঘর্ষের পর নির্গত পদার্থ থেকে উপগ্রহগুলোর সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, ‘মহাকর্ষীয় আকর্ষণ’ বা ক্যাপচার তত্ত্ব বলছে, ফোবোস ও ডেইমোস মূলত গ্রহাণু ছিল, যেগুলো মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে তার কক্ষপথে আটকা পড়ে।

কোন তত্ত্বটি সঠিক, তা নির্ধারণ করা গেলে পৃথিবী, মঙ্গলসহ পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কীভাবে তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে জাক্সা।

‘প্রাকৃতিক মহাকাশ স্টেশন’ হিসেবে ফোবোস

এই অভিযানের আরেকটি লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে ফোবোসকে ‘প্রাকৃতিক মহাকাশ স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা। ফোবোসে যাতায়াতের সম্ভাব্য পথ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত শর্ত নির্ধারণ করা গেলে ভবিষ্যতে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর পরিকল্পনায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মহাকাশযানটি মঙ্গলের অন্য উপগ্রহ ডেইমোসও পর্যবেক্ষণ করবে। তবে সেখানে অবতরণের পরিকল্পনা নেই।

নমুনা ফেরাতে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

মঙ্গল থেকে পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে সেখান থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাটি কার্যত বাতিল হয়ে যায়। জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসের ভোটের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ কর্মসূচি থেকে সরে আসে।

অন্যদিকে, চীনের তিয়ানওয়েন-৩ মহাকাশযান ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশটির লক্ষ্য, ২০৩১ সালের মধ্যেই মঙ্গল থেকে সংগৃহীত নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।

সেই পরিকল্পনা সফল হলে জাপানের এমএমএক্স অভিযানের নমুনা পৃথিবীতে ফেরার আগেই চীন মঙ্গল থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে জাপানের অভিযানটি সরাসরি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নয়, বরং এর উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে; যা সৌরজগতের ইতিহাস অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।