logo

ভরাডুবির পর ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসায় ট্রাম্প, পরাজয়ের জন্য দায়ী করলেন ইরান যুদ্ধকে

ভরাডুবির পর ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসায় ট্রাম্প, পরাজয়ের জন্য দায়ী করলেন ইরান যুদ্ধকে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এলএ টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলটির প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে নির্বাচনে নিজের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধেরও ভূমিকা আছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে এই বিপর্যয়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে কোনো দায় নিতে রাজি নন ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট। বরং দলের অন্য নেতাদের দিকে দায় ঠেলে দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৪ নভেম্বর) দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।

মঙ্গলবার ফক্স নিউজের ‘ডেমোক্রেসি ২৬’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলব, ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন। তারা ভালো করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা ১১ বছর ধরে এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে তারা সেটি পেয়েছে। তবে আমি এটিকে আমার বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখছি না।’

নির্বাচনী প্রচারণার বেশির ভাগ সময় ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট থেকে শুরু করে ইসলামপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ট্রাম্প। সে তুলনায় নির্বাচনের পর প্রতিদ্বন্দ্বীদের এমন প্রশংসা তার জন্য বেশ ব্যতিক্রমী।

ট্রাম্প আরও বলেন, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের মতো এবার ফলাফল নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় তাদের সঙ্গে কাজ করতেও তিনি প্রস্তুত।

তিনি বলেন, ‘অনেক বিষয়ে আমি তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারি।’।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা হয়তো ৫০টি চমৎকার বিল পাঠাবে, যেগুলো নিয়ে তারা খুবই উৎসাহী। আর আমি সেগুলোতে সুন্দর একটি সিল মেরে ফেরত পাঠাব, ভেটো।’

ইরান যুদ্ধও পরাজয়ের কারণ?

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অজনপ্রিয় ছিল।

এবার নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, এর একটি অংশ ছিল ইরান। তবে একই সঙ্গে মানুষ ইরানের ক্ষেত্রে আমি যা করেছি, তার গুরুত্বও বুঝতে পেরেছে।’

অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকার করলেও ইরানকে ঘিরে নিজের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন তিনি।

তবে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তার নমনীয়তা নিজের দলের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বারবার রিপাবলিকান ভোটারদের বলেছিলেন, তারা যেন কল্পনা করেন, ব্যালটে তার নিজের নাম রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার তিনি দাবি করেন, ব্যালটে তার নাম না থাকাটাই দলের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। যদি থাকতাম, তাহলে আমরা বিশাল ব্যবধানে জিততাম! এ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’

পরাজয়ের দায় চাপালেন দলের নেতাদের ওপর

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প জানান, তিনি এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন এবং কেন রিপাবলিকানরা হেরেছে, তা ব্যাখ্যা করবেন।

এরপরই তিনি সমালোচনা শুরু করেন টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে নিয়ে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসার কাছে অ্যাবটের পরাজয়ের জন্য তাকে দায়ী করেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের অভিযোগ, অ্যাবট যদি ‘রিপাবলিকান ইন নেম অনলি’ (রাইনো) না হতেন, তাহলে তাকে হারতে হতো না। রিপাবলিকান দলের ভেতরে যাঁদের দলীয় আদর্শের প্রতি যথেষ্ট অনুগত মনে করা হয় না, তাঁদের বোঝাতে ‘রাইনো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে যেসব প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পরাজিত হয়েছেন। তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফরও করেছিলেন।

এমনকি ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জন হাস্টেডের প্রশংসা করতে গিয়ে ট্রাম্প তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা অবশ্য প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রার্থীর যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যালটে থাকা অনেক প্রার্থীর প্রচারে তাদের নিজেদের চেয়েও বেশি ভালো কাজ করেছেন।’

হোয়াইট হাউসে হতাশার পরিবেশ

নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে এক ধরনের হতাশা ও আত্মরক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প ও তার মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা হোয়াইট হাউসের বিলাসবহুল ইস্ট রুমে এক অনুষ্ঠানে বসে নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেন।

এ সময় হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মী যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেইন ‘দ্য চিজকেক ফ্যাক্টরি’ থেকে খাবার আনিয়ে খান।

এ ঘটনাকে সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পুরোনো মন্তব্যের প্রতি পরোক্ষ কটাক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস সংস্কারকাজের সমালোচনা করতে গিয়ে ওবামা বলেছিলেন, ভবনটি দেখতে যেন সাদ্দাম হোসেনের খোলা কোনো চিজকেক ফ্যাক্টরির মতো লাগছে।

শেষ দুই বছর কঠিন হতে পারে ট্রাম্পের জন্য

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট; উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কংগ্রেসের দুই কক্ষই বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর ট্রাম্প কীভাবে তার বাকি মেয়াদ পরিচালনা করবেন।

হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ট্রাম্প সহজে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।

ইরানকে ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন প্রেসিডেন্ট; এমন জল্পনাও রয়েছে। ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধটি যে অজনপ্রিয়, নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আজ যারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন, ইরান সংঘাতের সমাধান হলে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে আসার পর তাঁদের মধ্যে অনুশোচনা তৈরি হবে। কিন্তু তখনও তাদের উদারপন্থী উগ্র ডেমোক্র্যাটদের তালিকা নিয়েই থাকতে হবে।’

একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আজ যা-ই ঘটুক না কেন, র‍্যাডিক্যাল বামপন্থীদের থামানোর ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংকল্প আরও শক্তিশালী হবে। সামনে কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’

নির্বাচনের এই ফলের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। এখন ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যে সম্পর্ক কোন দিকে যায়, তা-ই হবে মার্কিন রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।