logo

খামেনির নতুন নির্দেশ, তাহলে কী ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি হচ্ছে না

খামেনির নতুন নির্দেশ, তাহলে কী ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি হচ্ছে না
ছবি: সংগৃহীত

ইরান শর্তসাপেক্ষে রাশিয়ার কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে বলে খবর ছড়িয়েছিল। এ বিষয়ে সপ্তাহ যাবত ইরানি কর্তৃপক্ষের নীরবতার পর এবার নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানাল তেহরান। তারা তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে নারাজ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নির্দেশ জারি করছেন যে, দেশের প্রায়-অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো যাবে না। প্রায়-অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম বলতে সাধারণত ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামকে বোঝায়।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) দেশটির দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এই খবরের মাধ্যমে শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান একটি দাবির বিষয়ে তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হলো।

রয়টার্স বলছে, আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির এই আদেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরও হতাশ করতে পারে। একইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত ইরান থেকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর শান্তি চুক্তিতে এ বিষয়ে একটি ধারা অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। ইসরায়েলকে এমনটাই আশ্বাস দিয়ে আসছেন ট্রাম্প।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই ইরানি সূত্রের একজন বলেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ঐকমত্য হলো যে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশ থেকে বাইরে যাবে না।’

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, বিদেশে এই সামগ্রী পাঠালে দেশটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে খামেনির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ না করা পর্যন্ত, তেহরান তার প্রক্সি মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল না করা পর্যন্ত, তিনি এই যুদ্ধকে শেষ হয়েছে বলে মনে করবেন না।

শীর্ষ ইরানি নেতারা সন্দিহান

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এরপরে ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। আরেকদিকে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

কিন্তু শান্তি প্রচেষ্টায় কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। কারণ ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ ও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।

সূত্র দুটি জানিয়েছে, ইরানি নেতাদের মধ্যে গভীর সন্দেহ রয়েছে যে, বিমান হামলা পুনরায় শুরু করার আগে নিরাপত্তার আবহ তৈরি করার জন্য ওয়াশিংটন এই যুদ্ধবিরতিকে একটি কৌশলগত ছলনা হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরানের শীর্ষ শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার বলেছেন, শত্রুপক্ষের প্রকাশ্য ও গোপন চাল থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকানরা নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিন ট্রাম্পও বলেছেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে রাজি না হলে তেহরানের ওপর আরও হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘সঠিক উত্তর পাওয়ার জন্য’ ওয়াশিংটন কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পারে।

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, উভয়পক্ষ কিছু মতপার্থক্য কমাতে শুরু করেছে। কিন্তু তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর বিভেদ রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যত এবং সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতির জন্য তেহরানের দাবি।

ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়ে কঠোর হচ্ছে ইরান

ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তেহরানের অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো। বিশ্বাসযোগ্য এই নিশ্চয়তা পাওয়া যে, মার্কিন-ইসরায়েল আর তাদের ভূখণ্ডে কোনো আক্রমণ চালাবে না।

তারা বলেছেন, এই ধরনের আশ্বাস পাওয়ার পরেই ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হবে। যদিও তেহরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে।

তবে গভীরভাবে বিশ্বাস করা হয়, ইসরায়েলের একটি পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে। কিন্তু দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা কখনো নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। কয়েক দশক ধরে এই বিষয়ে অস্পষ্টতার আশ্রয় নিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তেল আবিব।

যুদ্ধের আগে ইরান তার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামের মজুতের অর্ধেক পাঠিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলার জন্য ট্রাম্পের বারবার হুমকির পর সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ট্রাম্প হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেবেন কিনা এবং তিনি ইসরায়েলকে অভিযান পুনরায় শুরু করার অনুমতি দেবেন কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আক্রান্ত হলে কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তেহরান।

ইরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে মজুত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ কমানোর মতো সমাধান রয়েছে।

আইএইএ-র ধারণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখন ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ অর্থাৎ ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এর কী পরিমাণ এখন অক্ষত আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি মার্চ মাসে বলেন, ওই মজুতের যা অবশিষ্ট ছিল তা ‘প্রধানত’ ইস্ফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি টানেল কমপ্লেক্সে সংরক্ষিত আছে।

আইএইএ-র ধারণা, সেখানে ২০০ কেজির কিছু বেশি পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর কিছু অংশ নাতাঞ্জের সুবিশাল পারমাণবিক কমপ্লেক্সেও রয়েছে, যেখানে ইরানের দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ছিল।

তবে ইরান বলছে, চিকিৎসা গবেষণা ও তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লি চালানোর জন্য তাদের কিছু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার। এই চুল্লিটি প্রায় ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে চলে।