
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনী হুতি। বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি পরিবাহি নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরিম (মায়ুন) দ্বীপ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দখলে নেয় দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। আগের দিনই তারা ঐতিহাসিক কৌশলগত বন্দর নগরী মোচা (আল-মাখা) দখল করে নেয়।
একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, হুতি বিদ্রোহীরা শুক্রবার ধুবাব শহরের দিকে অগ্রসর হলে সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী দ্বীপটি ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই অভূতপূর্ব বিজয়ের মাধ্যমে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করল গোষ্ঠীটি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের এই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ইউরোপ-এশিয়ার নৌ-বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। একইসঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপকে সংযোগকারী লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার এই প্রণালিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানকে এক শক্তিশালী নতুন দর কষাকষির সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে সৌদি আরব তাদের ২০ শতাংশ তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর প্রধানত নির্ভর করছিল। কিন্তু পেরিম দ্বীপ দখলে নেওয়ায় হুতিরা এখন বাণিজ্যিক নৌপথ অবরুদ্ধ করা বা নৌ চলাচলে হুমকি তৈরির বিশাল সক্ষমতা অর্জন করল। এই ঘটনার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত মে মাসের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেলে ১০৮ ডলার অতিক্রম করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, একই সময়ে সৌদি আরবের কৌশলগত পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের পথ ধরে ৬০ মাইল দীর্ঘ ধোঁয়ার কুণ্ডলী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন অবকাঠামোয় মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কও করা হচ্ছে। যদিও রিয়াদ বা হুতি কোনো পক্ষই এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট বিবৃতি দেয়নি।
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ সতর্ক করে বলেন, ‘হুতিরা এখন একইসঙ্গে সৌদি নিরাপত্তার দুটি মূল স্তম্ভে—দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত ও লোহিত সাগরের কৌশলগত গভীরে আঘাত হানছে। পরিস্থিতি পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব ধাক্কা দেবে।’
যদিও হুথি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুসসালাম এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। এই অঞ্চল নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ নেই।
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) শুক্রবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও তাইজ গভর্নরেটে তীব্র সংঘাতের কারণে মাত্র এক সপ্তাহে ৪৬ হাজারেরও বেশি বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ সংখ্যা প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।



