যেভাবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে এশিয়ার দেশগুলো

ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট। বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ হয় এই জলপথ দিয়ে। এই সরবরাহ অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়ার দেশগুলোতে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে দিনে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ যাতায়াত করতে পারছে। এরই মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকায় তেলের দাম আরও বেড়ে গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ। ফলে এই জলপথ বন্ধ হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে এই মহাদেশে।
সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ জ্বালানি সাশ্রয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থাসদৃশ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনেক দেশে কর্মীদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাঁচাতে কর্মসপ্তাহ ছোট করা এবং অতিরিক্ত জাতীয় ছুটি ঘোষণার মতো ঘটনাও ঘটছে। এমনকি অনেক দেশে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশাল মজুতের অধিকারী চীনও এই ধাক্কা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দেশটিতে জ্বালানির দাম এক লাফে ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জনরোষ কমাতে বেইজিং জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের চেষ্টা করছে।
যুদ্ধ হয়তো হাজার মাইল দূরে, কিন্তু এশিয়ার সাধারণ মানুষ বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই সংকট তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলছে।
ফিলিপাইনে জরুরি অবস্থা জারি
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ফিলিপাইনে এই সংঘাতের ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহের প্রাপ্যতা ও স্থিতিশীলতার ওপর তৈরি হওয়া ‘আসন্ন বিপদের’ প্রেক্ষিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
সাত হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এখানে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে—যার মধ্যে দেশটির জিপনি (সাশ্রয়ী গণপরিবহন) চালকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কার্লোস ব্রাগাল জুনিয়র নামক একজন চালক জানান, আগে ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যেখানে তিনি এক হাজার থেকে ১২০০ পেসো আয় করতেন, এখন তা কমে ২০০ থেকে ৫০০ পেসোতে ঠেকেছে। অতিরিক্ত শুল্ক ও ভাড়া বৃদ্ধির জটিলতায় আগে থেকেই পিষ্ট হওয়া এসব চালকদের অনেকেই এখন দিনশেষে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন।
কার্লোস আক্ষেপ করে বলেন, এই কাজ করেই আমি আমার মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি—একজন মাত্র স্নাতক শেষ করেছে এবং অন্যজন শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। আমাদের জীবন ভালোই কাটছিল। কিন্তু এখন আমরা জানি না আগামী কয়েক সপ্তাহে আমাদের ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে। যদি এটি চলতে থাকে, তবে এটি নিশ্চিতভাবে আমাদের এবং আমাদের পরিবারকে মেরে ফেলবে।
আরও পড়ুন: যুদ্ধ বন্ধে ইরানের পাঁচ শর্ত
শুধু জিপনি চালকরাই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত নন। জেলেরা এবং কৃষকরাও উচ্চ জ্বালানি খরচের সঙ্গে লড়াই করছেন। বুলাকানের বেশ কয়েকজন সবজি চাষি ইতোমধ্যেই চাষাবাদ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
সরকার বিষয়টি স্বীকার করে নগদ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু কার্লোস এবং অন্যরা এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। কার্লোস বলেন, সরকারের দেওয়া জ্বালানি ভর্তুকি পর্যাপ্ত নয়। এটি মাত্র দুই দিনের গাড়ি চালানোর খরচ মেটাবে। তাহলে দুই দিন পর কী হবে? আমাদের বর্তমান অবস্থা মহামারির (প্যান্ডেমিক) সময়ের চেয়েও খারাপ।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় থাইল্যান্ডের অভিনব কৌশল
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এক অভিনব পথ বেছে নিয়েছে থাইল্যান্ড। সরকারি সংবাদমাধ্যম থাই পিবিএসের সংবাদ উপস্থাপকরা এখন অন-এয়ারে প্রথাগত কোট বা ব্লেজার ছাড়াই সংবাদ পাঠ করছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি বার্তা প্রচার করা—জ্বালানি সংকটের এই সময়ে প্রচণ্ড গরমে উপযুক্ত পোশাক পরে শক্তি সাশ্রয় করুন।
দীর্ঘ ২০ বছরের সংবাদ উপস্থাপনার ক্যারিয়ারে সিরিমা সংকলিনকে সবসময় ফর্মাল স্যুটে দেখা গেলেও বর্তমানে তিনি সহকর্মীদের নিয়ে ব্লেজার ত্যাগ করেছেন। সিরিমা জানান, শুধু স্যুট খুলে ফেললেই জ্বালানি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না, তবে এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই, বর্তমান সংকট নিয়ে আমরা সচেতন। আমরা অন্যদের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছি।
থাইল্যান্ড সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- অফিস বা বাসাবাড়িতে এসির তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা।
- জ্বালানি খরচ কমাতে সমস্ত সরকারি দপ্তরে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ।
- প্রচণ্ড গরমেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হালকা পোশাক পরার উৎসাহ প্রদান।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক, তবুও থাই সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করেছে, দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত তাদের কাছে রয়েছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই নীতি বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন সংকটের মুখে শ্রীলংকা
২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন এক সংকটের মুখে পড়েছে শ্রীলংকা। তবে এবারের সংকটটি একটু ভিন্ন এবং বিড়ম্বনাপূর্ণ।
রাজধানী কলম্বোর বাসিন্দা দিমুথুর ভাষায়, আগেরবার পকেটে টাকা ছিল না বলে তেল কিনতে পারিনি, আর এবার টাকা আছে কিন্তু বাজারে তেলই নেই।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানিতে ব্যর্থ হয়েছিল দ্বীপরাষ্ট্রটি। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সম্প্রতি অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমান ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দেশটি আবারও ‘বেল্ট-টাইটেনিং’ বা কঠোর সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে শ্রীলংকা সরকার এখন প্রতি বুধবার ‘জাতীয় সরকারি ছুটি’ ঘোষণা করেছে। এছাড়া সাধারণ নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বরাদ্দের বা রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে এই সীমিত পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতেই সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার প্রভাব পড়ছে নিম্নবিত্ত মানুষের কর্মসংস্থানে। লন-মোয়ার অপারেটর নিমাল জানান, জ্বালানি নিতে লাইনে দাঁড়ানোর কারণে তিনি আজ কাজে যেতে পারেননি। তার আক্ষেপ, জ্বালানি জোগাড় করে যখন কাজে ফিরি, তখন দেখি আমার জায়গায় মালিক অন্য কাউকে নিয়ে নিয়েছেন।
মিয়ানমারের জোড়-বিজোড় নীতি
২০২১ সালের মে মাস থেকে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে সামরিক জান্তা সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য ‘জোড়-বিজোড়’ (একদিন অন্তর গাড়ি চালানো) নীতি চালু করেছে।
কো হতেত (ছদ্মনাম) নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে এই সংকটের প্রভাব তার কর্মজীবনের চেয়ে সামাজিক জীবনে বেশি পড়ছে। তিনি এখন গণপরিবহনে অফিসে যাতায়াত করছেন।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে জয় ঘোষণা ট্রাম্পের
তিনি বলেন, আমি সাধারণত বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সপ্তাহে বা মাসে একবার দেখা করি। কিন্তু এখন আমাদের আলোচনা করতে হয়, আমরা জোড় তারিখে দেখা করব নাকি বেজোড় তারিখে। আবার ওই সময়ে সবার আসা সম্ভব কি না তা নিশ্চিত করতে হয়।
তিনি আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতে জ্বালানির একটি নতুন কালোবাজার তৈরি হতে পারে—যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভারতে রান্নার গ্যাসে প্রভাব বেশি
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি ভারতীয় নাগরিক যেমন যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে রয়েছেন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে তেল ও গ্যাসের ঘাটতি বাসাবাড়ি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুভূত হচ্ছে।
পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যে তেলের চেয়ে গ্যাসের তীব্র সংকটে সিরামিক শিল্প প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কোনো শেষ না দেখে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ৪ লক্ষ শ্রমিক এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
শচীন পরাশর নামে এক শ্রমিক স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, কাজ ছাড়া এখানে থাকলে আমাকে না খেয়ে মরতে হবে। যারা এখনও সেখানে রয়ে গেছেন, তারাও দুশ্চিন্তায় আছেন।
টাইলস কারখানার আরেক শ্রমিক ভূমি কুমার বলেন, আমার মালিক খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল চললে কী হবে তা আমি জানি না।
ভারত এই প্রণালি বন্ধের ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির আমদানিকৃত লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) প্রায় ৬০ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে এবং সেই চালানের প্রায় ৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হয়।
শুধু কারখানাই নয়, মুম্বাইয়ের মতো ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের মেগাসিটিতেও এর প্রভাব পড়েছে। মার্চের প্রথম কয়েক সপ্তাহে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব খাবার রান্না করতে বেশি সময় লাগে, সেগুলো মেনু থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে, যদিও সরকার ঘাটতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার মনপ্রীত সিং বিবিসিকে বলেন, রেস্তোরাঁগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। রান্নার গ্যাস একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।