Advertisement

ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির ঘোষণা করল ভারতের আদালত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির ঘোষণা করল ভারতের আদালত
ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্সকে দেবী বাগদেবীর (সরস্বতী) মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। আদালত বলছে, স্থানটি রাজা ভোজের সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ও সরস্বতী মন্দির ছিল। সেখানে হিন্দুদের পূজার অধিকার বহাল থাকবে। এতদিন সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন মুসলিমরা।

শুক্রবার (১৫ মে) মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ এই রায় দেয় বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। আদালত জানায়, প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ঐতিহাসিক সাহিত্য অনুযায়ী, স্থানটির আসল চরিত্র হলো দেবী সরস্বতীর একটি মন্দির। আদালত মুসলিম সম্প্রদায়ের নামাজ পড়ার পূর্ববর্তী সার্কুলার বাতিল করেছে।

আদালত আরও বলেছে, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি যে এই স্থানে হিন্দু উপাসনার ধারাবাহিকতা কখনও বিলুপ্ত হয়নি। আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ঐতিহাসিক সাহিত্য থেকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিবাদমান এলাকাটি পরমার রাজবংশের রাজা ভোজের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ভোজশালা ছিল।’

হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা ও বিচারপতি অলোক অবস্থী গত ৬ এপ্রিল এই মামলা সম্পর্কিত পাঁচটি পিটিশন এবং একটি রিট আপিলের নিয়মিত শুনানি শুরু করেন। শুনানির সময় হিন্দু, মুসলিম ও জৈন সম্প্রদায়ের আবেদনকারীরা বিস্তারিত যুক্তি উপস্থাপন করে ওই স্থাপনাকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য একচেটিয়া প্রার্থনার অধিকার দাবি করেন।

ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দাবি

ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, হিন্দু সম্প্রদায় ভোজশালাকে বাগদেবীর (দেবী সরস্বতী) মন্দির বলে মনে করে। অন্যদিকে মুসলিম পক্ষ এই স্থাপত্যটিকে কামাল মাওলা মসজিদ হিসেবে দাবি করেন। এ ছাড়া জৈন সম্প্রদায়ের একজন আবেদনকারী দাবি, এই চত্বরটি একটি মধ্যযুগীয় জৈন মন্দির ও গুরুকুল।

মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় অবস্থিত এই বিতর্কিত স্থাপনাটি বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা।

গত এপ্রিলের শেষ দিকে ‘হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস’ নামের একটি সংগঠন এবং আরও দুজনের করা দুটি জনস্বার্থ মামলার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন কাজী মঈনুদ্দিন। ইন্দোর বেঞ্চে শুনানির সময় তিনি বলেন, ভোজশালা মামলায় কীভাবে তারা হস্তক্ষেপকারী হিসেবে যুক্ত হলো, সেটি পরিষ্কার নয়।

মঈনুদ্দিন নিজেকে সুফি সাধক মাওলানা কামালউদ্দিন চিশতীর বংশধর এবং প্রধান খাদেম বলে দাবি করেন। তার আইনজীবী নূর আহমেদ শেখ আদালতে দাবি করেন, তার মক্কেলের পূর্বপুরুষরা ঐতিহাসিকভাবে এই কমপ্লেক্সটির মালিকানার অধিকারী ছিলেন এবং সরকারি রাজস্ব নথিতেও স্থানটি একটি ‘মসজিদ’ হিসেবে নথিভুক্ত ছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত কামাল মাওলা মসজিদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থানটিতে ‘ধারাবাহিক ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস’ করে আসছেন।

মুসলিম আইনের উল্লেখ করে নূর আহমেদ শেখ আদালতে যুক্তি দেন, মসজিদ বা ধর্মীয় সম্পত্তির ক্ষেত্রে সাজ্জাদানশিন ও মুতাওয়াল্লিদের শুধু মামলায় হস্তক্ষেপ করার অধিকারই নয়, এসব স্থাপনা পরিচালনা ও ব্যবহারের অধিকারও রয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তির দেখভাল, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনের দায়িত্ব তাদের ওপরই থাকে। এই যুক্তি তিনি ১৯০৪ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ আইন প্রসঙ্গে তুলে ধরেন।

ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত
ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত

হিন্দু আবেদনকারীরা হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের সামনে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন যে, ঐতিহাসিক নথি ও আদালতের ২০২৪ সালের আদেশে এএসআই-এর করা বিতর্কিত স্থাপনাটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রতিবেদন তাদের দাবিকে স্পষ্টভাবে সমর্থন করে।

হাইকোর্টকে আবেদনকারীদের অন্যতম ‘হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস’-এর পক্ষে আইনজীবী বিষ্ণু শঙ্কর জৈন জানান, ঐতিহাসিক নথি, এএসআই-এর বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং আবেদনের সঙ্গে উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিতর্কিত কাঠামোটি মূলত দেবী সরস্বতীকে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দির ছিল।

তিনি দাবি করেন, এই চত্বরে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি, সংস্কৃত শ্লোক সম্বলিত শিলালিপি, একটি মণ্ডপ এবং একটি ‘হবনকুণ্ড’ (পবিত্র অগ্নিকুণ্ড) রয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভটি মসজিদ হতে পারে না। এই স্থাপনাটি ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দে ধারের পারমার রাজবংশের রাজা ভোজ কর্তৃক নির্মিত একটি হিন্দু কাঠামোর অংশ ছিল।

বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা

২০০৩ সালের এএসআই ব্যবস্থা অনুযায়ী, হিন্দু ও মুসলমানরা যথাক্রমে মঙ্গলবার ও শুক্রবার প্রার্থনা পড়া অব্যাহত রেখেছেন। হিন্দুদের পক্ষ থেকে কমপ্লেক্সটিতে প্রার্থনার জন্য একচেটিয়া অধিকার চেয়ে হাইকোর্টে এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

২০২৪ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট ভোজশালা মন্দির-কামাল মাওলা মসজিদ চত্বরের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানোর জন্য ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগকে (এএসআই) নির্দেশ দেয়। এএসআই সে বছরের ২২ মার্চ সমীক্ষাটি শুরু করে এবং ৯৮ দিনব্যাপী একটি বিস্তারিত সমীক্ষার পর আদালতে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

স্মৃতিস্তম্ভটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক তদন্তের পর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) তাদের দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলেছে, বর্তমান মসজিদের আগে সেখানে পারমার রাজাদের আমলের একটি বড় স্থাপনা ছিল। পরে সেই পুরোনো স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে বর্তমান বিতর্কিত কাঠামোটি তৈরি করা হয়।

হিন্দু পক্ষের দাবি, সমীক্ষায় পাওয়া মুদ্রা, ভাস্কর্য ও শিলালিপি প্রমাণ করে যে জায়গাটি আগে একটি মন্দির ছিল।

অন্যদিকে মুসলিম পক্ষ আদালতে বলেছে, এএসআইয়ের প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট এবং হিন্দু পক্ষের দাবিকে সমর্থন করতেই এটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এএসআই এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের তিনজন সদস্যসহ বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে পুরো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা এই স্থানটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু, মুসলিম ও জৈন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ চলছিল।