অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আদালতের ভর্ৎসনা, বিদেশ ভ্রমণে লাগাম

নির্বাচনি প্রচারণায় ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্য করার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানা হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের জন্য তাকে আদালতের অনুমতি নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) শর্তসাপেক্ষে আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত তার আগাম জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়৷
এদিন আদালতে অভিষেকের হয়ে হাজির হন তার আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়। শুরুতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি৷ বলেন, ‘তিনবারের সাংসদ, সর্বভারতীয় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক কেন এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন?’
অভিষেকের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ভোটের আগে কিছু ঘটনা ঘটছিল, হয়ত তারই প্রেক্ষিতেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন৷ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। রাজনৈতিক জনসভা থেকে এমন মন্তব্য করেন।’
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, অন্য কারও বিষয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছে না। আপনি আদালতে এসেছেন, তাই আপনাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে। সর্বভারতীয় সম্পাদক এমন মন্তব্য করবেন, আর তারপর ৪ মে ফলাফল যদি ভিন্ন হত তাহলে কী হত?’ এর পরিপ্রেক্ষিতে কল্যাণ যুক্তি দেন, ‘নির্বাচনের সময় এমনিতেই পারদ চড়া থাকে।’
বিচারপতির মন্তব্য করেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস অন্য কথা বলছে। তার কাছ থেকে এমন মন্তব্য আশা করা যায় না। তিনি বিচক্ষণ মন্তব্য করবেন, এটাই তো হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক দেশে যে কোনও দল জিততে বা হারতে পারে। একজন সাংসদের কী এমন মন্তব্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? যদি ফলাফল উল্টো হত? এর ফলে কী ঘটত?’
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘রাজ্যে তো একটা কালো ইতিহাস আছে। ভোট পরবর্তী সহিংসতার ইতিহাস আছে। কী করতেন তখন? সংবাদপত্রে এই খবরে ছেয়ে গেছিল। এই ধরনের মন্তব্য কী তার স্ট্যাটাসের সঙ্গে যায়? আপনি তো বলছেন মামলাকারী সর্বভারতীয় জেনারেল সেক্রেটারি।’
এরপরে তৃণমূল সাংসদকে তীব্র ভর্ৎসনা করলেও শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেয় হাইকোর্ট। আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। একইসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।
পাশাপাশি বলা হয়েছে, অভিষেককে তদন্তে নোটিশ দিয়ে ডেকে পাঠালে তদন্তে সহযোগিতা করবে। আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে পারবে না। নূন্যতম ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিতে হবে অভিষেককে। এ নির্দেশও দেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২০ জুলাই দিন ধার্য করেন আদালত।
এর আগে, গত ১৪ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারণা চলাকালে এক জনসভায় বিজেপি নেতা অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ করে অভিষেক বলেন, ‘বিজেপির সঙ্গে বেশি উদারতা দেখাতে নেই। আর আমাদের সৌজন্যতা আমাদের দুর্বলতা নয়। যারা মানুষের প্রতি অবিচার করেছে, মানুষকে অপমানিত করেছে, তাদের জন্য এবার রবীন্দ্রসংগীত নয়, ৪ তারিখ ডিজে বাজবে। তৈরি থাকো।’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি শাহকে বলব, ৪ তারিখ বাংলায় থাকবেন আপনি।’ এরপর ১৮ এপ্রিল ফের অভিষেক বলেন, ‘অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ, উনি বলেছেন, চুন চুনকে হিসাব হোগা। আমি বলি, যদি বুকের পাটা থাকে ৪ তারিখ বাংলায় থাকবেন। কলকাতায় দেখা হবে বেলা ১২টার পর। কত ধানে কত চাল বুঝব।’
এরপর আবার ২৭ এপ্রিল নাম উল্লেখ না করে অমিত শাহকে নজিরবিহীন আক্রমণ করেছিলেন অভিষেক। বলেন, ‘৪ তারিখে দেখব দিল্লির কোন বাবা বাঁচাবে।’ তার এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিষেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় এফআইআর।
পরপর দুই বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে গত ১৫ মে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
রাজীব সরকার নামে বাগুইআটির এক বাসিন্দা ইমেইল করে এই অভিযোগ দায়ের করেন অভিষেকের বিরুদ্ধে। যে মামলায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কা বাড়ছিল। কেমন পরিস্থিতিতে বিধাননগর সাইবার থানার সেই এফআইআর খারিজ করার আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

