logo

১৬ বছরের কম বয়সিদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করছে যুক্তরাজ্য

১৬ বছরের কম বয়সিদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করছে যুক্তরাজ্য
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। গতকাল সোমাবার দেশটির সরকার ঘোষণা দিয়েছে, আগামী বছরের শুরু থেকে এই নিয়ম কার্যকর করা হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং এক্সের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা শিশুদের সহজে আসক্ত করে ফেলে। এই আসক্তি কিশোর-কিশোরীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়ে অসুখী করে তুলছে।

দেশটির সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার আশা করছেন এই নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিলটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পাস হবে এবং এরপরই আইনে পরিণত হবে। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এটি পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।

সংবাদমাধ্যম ডিডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের আগে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রাজিল এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও শিশুদের সুরক্ষায় একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

নিজে দুই কিশোর সন্তানের বাবা প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। শিশু সুরক্ষা নিয়ে দেওয়া এক ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘আজ প্রত্যেক অভিভাবক নিজের চোখে দেখছেন, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের অসুখী করে তুলছে। আমি এমন অনেক পরিবারের কান্না ও আকুতি সরাসরি শুনেছি, যারা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চান। আমরা এই পরিবারগুলোর কল্যাণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেব।’

যুক্তরাজ্য সরকারের নতুন এ পদক্ষেপে হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপগুলোকে বাইরে রাখা হয়েছে। সরকারের এই কল্যাণমুখী পদক্ষেপকে প্রিন্স হ্যারি এবং তার স্ত্রী মেগান মার্কেলসহ বহু শিশু অধিকার কর্মী স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের একটি বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এ ধরনের ঢালাওভাবে নিষেধাজ্ঞা শিশুদের আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক প্ল্যাটফর্মের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইউটিউবের একজন মুখপাত্র এ প্রসঙ্গে বলেন, এমন নিষেধাজ্ঞা শিশুদের একটি নিয়মতান্ত্রিক, নজরদারিতে থাকা এবং উপকারী পরিবেশ থেকে বের করে সম্পূর্ণ বেনামী ও কম নিরাপদ ওয়েবসাইটের দিকে ধাবিত করে।

একইভাবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা সতর্ক করে বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে কিশোর-কিশোরীরা এমন সব অনলাইন বিকল্প বেছে নিতে পারে যেখানে অভিভাবকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

অবশ্য এই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি মেনে নিয়েছেন, কিছু চতুর কিশোর-কিশোরী এই নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করবে। তবে এর জবাবে তিনি তামাক ও অ্যালকোহল বিক্রির ওপর থাকা বয়সসীমার উদাহরণ টেনে বলেন, আইন থাকার পরও কিছু কিশোর বয়স হওয়ার আগে মদ্যপানের উপায় ঠিকই খুঁজে নেয়। কিন্তু তার মানে এই নয়, আমরা তাদের কাছে অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করার সব প্রচেষ্টা বাদ দেব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের আইন সফলভাবে কার্যকর করতে পারব আমরা।

এদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বর্তমানে দেশীয় বাজারে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অভিবাসন সমস্যা এবং সামরিক খাতের খরচ নিয়ে দেশে সরকারের সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। এমনকি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার নিজের দল লেবার পার্টির ভেতর থেকে নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ বা বিরোধের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তার।

তবে তার এ সিদ্ধান্তটি দেশের ভেতর দারুণ জনপ্রিয় হতে পারে এবং এটি তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে একটি ইতিবাচক অধ্যা যোগ করবে। কারণ সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ অভিভাবক শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী এলেন রুম এই আইনকে সমর্থন করে বলেন, ‘প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যদি কোনো ভালো পরিবর্তন করতে চাইত, তবে তারা এতদিনে তা করতে পারত। কিন্তু তারা ইচ্ছে করেই তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা যদি সুধরে না যায়, তবে আমাদের আইনগতভাবে কঠোর হতে হবে।’