logo

বিশ্বকাপ আমেরিকায়, বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা আরব বিশ্বে

বিশ্বকাপ আমেরিকায়, বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা আরব বিশ্বে
ছবি: সংগৃহীত

এবারে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা হবে হাজার মাইল দূরে উত্তর আমেরিকার তিন দেশে। তবে এই বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বড় সুফল পেতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলো। রেকর্ডসংখ্যক আটটি আরব দেশ অংশ নিচ্ছে এবারের বিশ্বকাপে। আর এতেই বিশ্বমঞ্চে দেশগুলোর জন্য বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টুর্নামেন্টটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হলেও এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক পরিচিতি বা ‘এক্সপোজার’ আরব বিশ্বের অর্থনীতিতে একটি বড়সড় ইতিবাচক ধাক্কা দিতে পারে।

আয়োজকদের দেওয়া অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের এক গবেষণার তথ্যমতে, ৪৮টি দল নিয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই বর্ধিত টুর্নামেন্টে প্রায় ৬৫ লাখ দর্শকের সমাগম ঘটবে। এই সমাগমে বৈশ্বিক জিডিপিতে ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে টিকিট, ভ্রমণ, হোটেলের খরচ এবং আয়োজক শহরগুলোর ওপর চাপের বিষয়গুলো হিসাব করলে চূড়ান্ত প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে।

এই টুর্নামেন্টে এবার সৌদি আরব, কাতার, মরক্কো, তিউনিসিয়া, মিশর, আলজেরিয়ার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে জর্ডান এবং দীর্ঘ ৪০ বছর পর ফিরছে ইরাক। এই অঙ্ক ২০১৮ সালে আরব দেশের অংশগ্রহণের রেকর্ডের ঠিক দ্বিগুণ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা ইটোরোর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক জশ গিলবার্ট এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় বলেন, আরব অর্থনীতির জন্য আসল পুরস্কার কেবল টুর্নামেন্ট বা ট্রফিই নয়; বরং এর সঙ্গে বিশ্বব্যাপী যে পরিচিতি আসবে, তা-ই মূল চালিকাশক্তি। টুর্নামেন্টে একটি ভালো পারফরম্যান্স একটি দেশকে বিশ্ববাসীর সামনে যেভাবে তুলে ধরে, তা কোনো পর্যটন বাজেট বা বিজ্ঞাপন দিয়েও অর্জন করা সম্ভব নয়।

এর সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ মরক্কোর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ অভিযান। ওই বিশ্বকাপে মরক্কো সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পর ২০২৩ সালে তারা ১ কোটি ৪৫ লাখ দর্শনার্থীকে নিজেদের দেশে স্বাগত জানায়। এর আগের বছরের তুলনায় এ হিসাব ৩৪ শতাংশ বেশি ছিল।

গিলবার্টের মতে, বিশ্বকাপ মরক্কোকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। ফাইনালের বাঁশি বাজার অনেক পরও পর্যটনের চাহিদাকে টিকিয়ে রেখেছিল। ঠিক একই প্রভাব এবার আরও বড় আরব লাইন-আপের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে, বিশেষ করে কোনো দল যদি পরের রাউন্ডগুলোতে যেতে পারে। এর ফলে পর্যটন বোর্ড, বিমান সংস্থা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলো লাভবান হবে। ফলে বিশ্বকাপের উন্মাদনা আর শুধু আয়োজক শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এই অর্থনৈতিক সুবাতাস সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে পর্যটন খাত এরই মধ্যে দ্রুত বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চল ২০২৪ সালে ৭ কোটি ২২ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটককে আকর্ষণ করে। ২০১৯ সালের চেয়ে এ হিসাব ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আর ২০২৫ সালে আমিরাতের হোটেলগুলোতে রেকর্ড ৩ কোটি ২৩ লাখ ৪০ হাজার ভ্রমণকারীকে স্বাগত জানায়।

যদিও আরব আমিরাত কোনো ম্যাচ আয়োজন করছে না বা খেলায় অংশ নিচ্ছে না, তবুও বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় খরচের খাতের মাধ্যমে সেখানে প্রবাহিত হবে। ভক্তরা বিমান টিকিট, হোটেলে থাকা, খেলা দেখার পার্টি, স্পোর্টস বার, রেস্তোরাঁ, ফুড ডেলিভারি, জার্সি-মার্চেন্ডাইজ, বিজ্ঞাপন, পেমেন্ট এবং স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশনের পেছনে প্রচুর খরচ করবেন। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, পেমেন্ট প্রদানকারী এবং ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোও লাভবান হবে।

সম্প্রতি সৌদি আরবও ফুটবল বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে কাতার, আমিরাত ও মরক্কো পর্যটন ও বৈশ্বিক পরিচিতিকে কেন্দ্র করে তাদের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খেলাধুলাকে ব্যবহার করছে।

গিলবার্ট বলেন, বিশ্বকাপ একাই আঞ্চলিক অর্থনীতিকে বদলে দেবে না, তবে এটি সঠিক দিকে এগিয়ে যাওয়া খাতগুলোর জন্য সহায়ক শক্তি হবে। আর আগের চেয়ে বেশি আরব দল থাকায় মেনা অঞ্চল এবার আরও বড় মঞ্চ পেয়েছে।

তবে বড় ইভেন্টগুলোর এই বিশাল অংকের হিসাব নিয়ে অর্থনীতিবিদরা কিছুটা সতর্ক। সাক্সো’র বিনিয়োগ বিশ্লেষক ডোরিয়ান অ্যাংলাডা বলেন, বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব বাস্তব হলেও তা ঘনীভূত ও সাময়িক এবং লাভগুলো মূলত স্থানীয় ও নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

সাক্সোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই টুর্নামেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে ১৭ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে (যা মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম)। মেক্সিকো ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি দৃশ্যমান বুস্ট পেতে পারে এবং কানাডার ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের লাভকে তাদের সরকারি আয়োজন খরচের বিপরীতে মেলাতে হবে।

অ্যাংলাডা উল্লেখ করেন, এই অর্থনীতির একটি বড় অংশের মূলে রয়েছে সম্পদ সৃষ্টির চেয়ে পুনর্বণ্টন, যেখানে খরচ এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরিত হয়। অবশ্য এবার তিন আয়োজক দেশের স্টেডিয়াম অবকাঠামো প্রস্তুত থাকায় ব্যয়বহুল ভেন্যু অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি কম, যা অতীতে একটি বড় সমস্যা ছিল।

অর্থনীতির এই হিসাবে কে টাকা গুনছে তাও একটি বড় বিষয়। ফিফা মূলত সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, লাইসেন্সিং, টিকিট ও আতিথেয়তার মতো কেন্দ্রীয় উৎস থেকে লাভবান হয়। অন্যদিকে, আয়োজক শহরগুলোকে নিরাপত্তা, পরিবহন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিষেবা, স্যানিটেশন ও রাস্তা বন্ধ করার খরচ সামলাতে হয়।

২০২৬ টুর্নামেন্টে এরই মধ্যে সেই চাপ দেখা যাচ্ছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফেমা ১১টি শহরকে নিরাপত্তার জন্য ৬২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, কানাডায় টরন্টোর খরচ বেড়ে ৩৮০ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে এবং ফক্সবোরোতে জননিরাপত্তা খরচ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক রাজস্ব এবং স্থানীয় খরচের এই বিভাজনের কারণে অর্থনীতিবিদরা একে সহজ মুনাফার চালক ভাবার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।

পরিশেষে, আটটি আরব দলের প্রতিযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলোকে বৈশ্বিক মনোযোগের এক বিরল সুযোগ করে দিচ্ছে। ২০৩০ সালের সহ-আয়োজক হিসেবে মরক্কোর ভূমিকা বর্তমান চক্রটিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা এই বছরের আরব প্রতিনিধিত্বকে বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘ আঞ্চলিক প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত করে। তবে তাৎক্ষণিক বিজয়ী হিসেবে হোটেল, বিমান সংস্থা, রেস্তোরাঁ ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোর নাম থাকলেও, আসল দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে এই পরিচিতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী বিনিয়োগ ও টেকসই জাতীয় ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত হতে পারে কি না তার ওপর।

সূত্র: গালফ নিউজ