চার দশকেও কাটেনি লক্ষ্মীছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল দশা

খাগড়াছড়ির দুর্গম লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। তবে দীর্ঘ চার দশকেও এই হাসপাতালটির বেহাল দশা কাটেনি। জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনে সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর নানা সংকটের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে এখানে সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই অচলাবস্থা দূর করতে ২০১৯ সালে আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘ ৭ বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ক্যাজ্বরি মগ বলেন, আমরা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এখানে চিকিৎসা নিতে আসি। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল নেই। সারাদিন একজন মাত্র নার্স আমাকে দেখে গেছেন, আর কাউকে আসতে দেখিনি। ভবনের অবস্থাও খুবই খারাপ; বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। তার ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। নতুন ভবনটি দ্রুত চালু হলে আমাদের কষ্ট অনেক কমতো।
আরেক রোগী সুর্পনা চাকমা বলেন, জরুরি চিকিৎসার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে খুব ভয় লাগে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় আমাদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই, বাধ্য হয়ে এখানেই আসতে হয়। এই হাসপাতালের উন্নয়ন হলে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার মানুষ সঠিক সেবা পাবে।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. ফোরকান হাওলাদার বলেন, আমাদের পিছিয়ে পড়া দুর্গম এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় নতুন ভবনের অপেক্ষায় আছে। ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো হাসপাতাল না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে আসেন। অথচ এখানে ঠিকমতো বিদ্যুৎ থাকে না। দীর্ঘদিনেও নতুন ভবনটির কাজ শেষ না হওয়ায় সবাই হতাশ। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

লক্ষ্মীছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. মোবারক হোসেন বলেন, লক্ষ্মীছড়ির মানুষের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন বছরের পর বছর এভাবে পড়ে আছে। দ্রুত কাজ শেষ করে এটি চালু করা উচিত। নতুন ভবনটি পুরোদমে চালু হলে দুর্গম এই উপজেলার মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালটির এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, আমাদের হাসপাতালে স্টাফের সংখ্যা খুবই কম। একসঙ্গে দুই-তিনজন প্রসূতি রোগী আসলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় অস্ত্রোপচার বা ডেলিভারির সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে বাধ্য হয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়। এছাড়া হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড ব্যতীত অন্য কোনো বিশেষায়িত ওয়ার্ড নেই, ফলে সব ধরনের রোগীকে একসঙ্গেই রাখতে হয়। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এখানে চিকিৎসক বা নার্সরা এসে থাকতে চান না। নতুন ভবনটি দ্রুত চালু করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই পরিবেশ উন্নত হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সাইদুল ইসলাম সোহেল বলেন, বর্তমান ভবনটি অনেক পুরোনো। সীমিত অবকাঠামো ও নানাবিধ সংকটের মধ্যেই আমাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে রোগীদের আরও উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা সার্বিক বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করছি।
খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. রতন খীসা বলেন, ২০১৯ সালে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আনুষাঙ্গিক সুবিধাসহ ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়েছিল। ভবনটির প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ঠিকাদার আপাতত (সরকার পরিবর্তনের পর থেকে) পলাতক রয়েছেন। নতুন করে সরকার যদি বাকি কাজের জন্য দরপত্র দিয়ে অসম্পূর্ণ কাজটি শেষ করার ব্যবস্থা নেয়, তবে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। আমরা কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত চিঠি দিয়েছি।





