মদিনার যে মসজিদ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)

মক্কা বিজয়ের ফলে ইতিহাসের গতি বদলে যায়। লোকজন দলে দলে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিতে শুরু করেন। এদিকে মুতার প্রান্তরে রোমানদের সঙ্গে মুসলমানদের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় আরব ও এর আশপাশে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে রোমানদের শোষণ থেকে মুক্তির চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। সিরিয়ার রোম-আরব সীমান্ত অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রোমসম্রাট মুসলমানদের দমন করতে ৪০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) খবর পেয়ে ৩০ হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে তাবুকের দিকে রওনা করেন। (আর-রাহিকুল মাখতুম, সফিউর রহমান মুবারকপুরি, সমকালীন প্রকাশন, পৃষ্ঠা: ৬২১-৬২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবুক যাওয়ার পথে এক ঘণ্টা পথ চলে জুআওয়ান নামক স্থানে থামেন। কুবা মহল্লায় নতুন মসজিদ নির্মাণকারীরা মহানবীর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কুবার বর্তমান মসজিদটি আমাদের থেকে বেশ দূরে। দুর্বলদের জন্য এবং বৃষ্টির রাতে নামাজ পড়ার জন্য আমরা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি এতে আসবেন এবং নামাজ পড়ে মসজিদটি উদ্বোধন করে দেবেন। এতে আমাদের কল্যাণ হবে।’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘আমি সফরে যাচ্ছি। ফেরার পথে তোমাদের এখানে যাব, ইনশাআল্লাহ।’ (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ৫৯২)
তাবুক থেকে ফিরছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। মদিনার কাছকাছি পৌঁছলে জিবরাইল (আ.) মসজিদ বিষয়ে আয়াত নিয়ে হাজির হলেন। তাঁকে মুনাফিকদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে অবহিত করলেন। মহানবীকে সেখানে নামাজ পড়া তো দূরের কথা, দাঁড়াতেই নিষেধ করা হলো। জানিয়ে দেওয়া হলো, এ মসজিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করা। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা মসজিদ তৈরি করেছে ক্ষতিসাধন, কুফুরি এবং মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আর যে ব্যক্তি আগে থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে, তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমাদের উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া নয়। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তারা নিশ্চিত মিথ্যাবাদী। তুমি ওর ভেতরে কখনো দাঁড়াবে না। প্রথম দিন থেকেই যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার (খোদাভীতি) ওপর প্রতিষ্ঠিত, তোমার দাঁড়ানোর জন্য সেটাই অধিক উপযুক্ত, সেখানে এমন সব লোক আছে যারা পবিত্রতা লাভ করতে ভালোবাসে, আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। কে উত্তম; যে তার ভিত্তি আল্লাহভীরুতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর স্থাপন করে সে, না ওই ব্যক্তি; যে তার ভিত্তি স্থাপন করে পতনোন্মুখ একটি ধসের কিনারায়, যা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে ধসে পড়বে? আল্লাহ অত্যাচারীদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। তাদের তৈরি ঘরটি তাদের অন্তরে সবসময় সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে, যে পর্যন্ত না তাদের হৃদয়গুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহা প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ১০৭-১১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখনই একদল সাহাবিকে এই মসজিদ ভাঙার জন্য পাঠালেন। তিনি মদিনায় পৌঁছার আগেই তারা মসজিদটি একেবারে ধ্বংস করে দেন। ইতিহাসে একে ‘মসজিদে জিরা’র (জেদবশত মসজিদ) বলা হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪৪)
তাফসিরুল মুনিরে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মালিক বিন দুখশুম, মাআন বিন আদি, আমের বিন সাকান ও ওহশিকে ডেকে এই মসজিদ জ্বালিয়ে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে তারা সেটি জ্বালিয়ে দেন এবং ধ্বংস করে ফেলেন। অবিশ্বাসের বিস্তার ও মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ব্যক্তিদের ঘাঁটি হিসেবে এ মসজিদ বানানো হয়েছিল। সেখানে তারা লোক দেখানো নামাজ পড়ত আর অশান্তি সৃষ্টি এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বহিঃশত্রুর আক্রমণের সুযোগ তৈরিসহ নানা রকম ষড়যন্ত্র করত।
খ্রিষ্টান পাদরি আবু আমেরের উসকানিতে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আবু আমের ছিল পথভ্রষ্ট ও অবিশ্বাসী। মহানবী (সা.) মদিনায় আসার পর আবু আমের একবার তাঁর কাছে এসে ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করল। নবী উত্তর দিলেন। কিন্তু সে সন্তুষ্ট হলো না। বলল, ‘আমাদের মধ্যে যে মিথ্যুক, সে যেন অভিশপ্ত ও আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যায়। আর আমি আপনার প্রতিপক্ষের সাহায্য করব।’
আবু আমের প্রতিটি যুদ্ধে মুসলমানদের বিরোধিতা করে চলল। হাওয়াজেনরা মুসলমানদের কাছে পরাজিত হলে সে সিরিয়ায় চলে যায়। সিরিয়া ছিল সেসময় খ্রিষ্টানদের কেন্দ্র। সেখানে আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এর আগে রোম সম্রাটকে মদিনায় আক্রমণের প্ররোচনা দিয়েছিল আবু আমের। তখন সে মদিনার মুনাফিকদের কাছে চিঠি লিখেছিল, ‘রোমসম্রাটকে দিয়ে মদিনায় আক্রমণের চেষ্টা আমি করছি। সম্রাটের সাহায্যের জন্য সম্মিলিত শক্তি গড়ে তোল। সেজন্য মসজিদের নাম দিয়ে তোমরা একটি ঘর বানাও। সে ঘরে সংগঠিত হও, যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম রাখো। পরস্পরে কর্মপন্থা ঠিক করো। একটা সশস্ত্র বাহিনী আমার সঙ্গে নিয়ে আসব। মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথিদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করব।’ (তাফসিরে মাআরিফুর কোরআন, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৬২)
মদিনার বারোজন মুনাফিক তাই করল। মদিনার অদূরে কুবা এলাকায় একটি মসজিদ করল। এটি মসজিদে জিরার নামে পরিচিত। পরে আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একদল সাহাবি পাঠিয়ে মসজিদটি ধ্বংস করে দেন। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ৫৯২-৫৯৩)
মুসলিম সমাজের মূল কেন্দ্র মসজিদ। মুসলমান যেখানে বসতি গড়বে, সেখানে গড়ে উঠবে মসজিদ, এটা মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের সময় যাত্রাবিরতিকালে কুবা নামক স্থানে ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে মদিনায় পৌঁছে তিনি মসজিদে নববি স্থাপন করেন।
মসজিদ নির্মাণ সওয়াবের কাজ। আল্লাহকে খুশি করার মাধ্যম। আল্লাহ মানুষকে মসজিদ নির্মাণে উৎসাহিত করেছেন। মহানবী (সা.) তাগিদ দিয়েছেন। জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে মসজিদ নির্মাণ হতে হবে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির ওপর ভিত্তি করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। মুসলমানদের কল্যাণের জন্য। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য। লোক দেখানো, লৌকিকতা প্রদর্শন, আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বা ইসলামের ক্ষতিসাধনে মসজিদ নির্মাণ করা যাবে না।






