বারবার ক্ষুধা লাগে, মনোযোগ কমে যায়, নেপথ্যে রয়েছে যে কারণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বারবার ক্ষুধা লাগে, মনোযোগ কমে যায়, নেপথ্যে রয়েছে যে কারণ
ছবি : এআই

বারবার ক্ষুধা লাগছে, কাজের মাঝে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না, আবার অল্প পরেই মিষ্টি বা অন্য কিছু খেতে ইচ্ছা করছে? অনেকেই এসবকে সাধারণ ক্লান্তি বা ব্যস্ততার প্রভাব বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন লক্ষণের পেছনে অনেক সময় রক্তে শর্করার ওঠানামা দায়ী থাকে। শুধু ডায়াবেটিস রোগী নয়, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

Advertisement

রক্তে শর্করার মাত্রা সারাদিন স্থিতিশীল থাকলে শরীরে শক্তি বজায় থাকে, অকারণে ক্ষুধা কম লাগে, মনোযোগ ভালো থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও কমে। তাই শুধু মিষ্টি কম খেলেই হবে না, সঠিক খাবার নির্বাচন, সময়মতো খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে সারাদিন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

প্রতিটি খাবারে ভারসাম্য রাখুন

খাবারের প্লেটে শুধু ভাত বা রুটি থাকলেই চলবে না। এমনভাবে খাবার সাজাতে হবে, যাতে শরীর ধীরে ধীরে শক্তি পায়।

পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন: প্রতিদিনের খাবারে মুরগির মাংস, মাছ, ডাল, ডিম, শিমজাতীয় খাবার বা টোফুর মতো প্রোটিন রাখুন। প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট ধীরে হজম হতে সাহায্য করে, ফলে রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ে না।

স্বাস্থ্যকর চর্বি খান: অ্যাভোকাডো, বিভিন্ন ধরনের বাদাম এবং অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি হজমের গতি কমিয়ে রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান: শাকসবজি, ডাল, ওটস, লাল চাল এবং অন্যান্য পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারে প্রচুর আঁশ থাকে। এগুলো দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ায়।

পরিশোধিত শস্যের বদলে শস্য বেছে নিন: সাদা চাল বা ময়দার পরিবর্তে লাল চাল, গম, ওটস, কুইনোয়া কিংবা অন্যান্য পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার বেশি উপকারী।

অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন: সফট ড্রিংকস, মিষ্টি পানীয়, কেক, পেস্ট্রি এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত অনেক চিনি থাকে। এগুলো যতটা সম্ভব কম খাওয়ার চেষ্টা করুন।

কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার বেছে নিন

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআই হলো এমন একটি মান, যা বলে দেয় কোনো খাবার কত দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ায়। যেসব খাবারের জিআই কম, সেগুলো ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ায়।

এ ধরনের খাবারের মধ্যে রয়েছে ওটস, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, অধিকাংশ সবুজ শাকসবজি এবং শস্যজাতীয় খাবার।

খাবারের সময় ঠিক রাখুন

শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সকালের নাশতা বাদ দেবেন না: ঘুম থেকে ওঠার দুই ঘণ্টার মধ্যে সকালের নাশতা খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে শরীর দিনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পায় এবং রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকে।

খাবার খাওয়ার সঠিক ক্রম মেনে চলুন: বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রথমে শাকসবজি, এরপর প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং সবশেষে ভাত, রুটি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট খাওয়া ভালো। এতে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

নিয়মিত সময়ে খাবার খান: প্রতি তিন থেকে চার ঘণ্টা পরপর কিছু না কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগবে না এবং একসঙ্গে বেশি খাওয়ার প্রবণতাও কমবে।

পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন: ছোট প্লেট ব্যবহার করলে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। এতে অজান্তেই অতিরিক্ত খাওয়া কমে যায়।

স্বাস্থ্যকর নাশতা বেছে নিন: ফল খেলে তার সঙ্গে একমুঠো বাদাম বা অল্প পরিমাণ পনির খেতে পারেন। এতে রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনুন

খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনের অভ্যাসও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।

খাবারের পর একটু হাঁটুন: খাওয়ার পর মাত্র ১০ মিনিট হাঁটলেও রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া সপ্তাহে অন্তত তিন দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং করলে শরীর ইনসুলিন আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুমান: প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো ঘুম শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের ঘাটতি হলে রক্তে শর্করার ওঠানামা বেড়ে যেতে পারে।

মানসিক চাপ কমান: অতিরিক্ত মানসিক চাপ রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে। গভীর শ্বাস নেওয়া, ধ্যান, প্রার্থনা বা হালকা ব্যায়ামের মতো অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দিতে সহজে কাজ করতে পারে।

অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন

একবারে বেশি খাওয়ার বদলে পরিমিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করলে শুধু রক্তে শর্করা নয়, ওজন নিয়ন্ত্রণেও সুবিধা হয়।

নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন

বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন খাবার বা কোন অভ্যাস রক্তে শর্করাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। সেই অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা সহজ হয়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা কোনো এক দিনের কাজ নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের ফল।

সুষম খাবার খাওয়া, সময়মতো খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার মতো সাধারণ অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হচ্ছে, তারা অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ঠিক করবেন। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শই সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: এনডিটিভি