আলজাজিরার কলাম/কেন আরব লিগ ইসরায়েলের গণহত্যা থামাতে পারল না?

রামি জি খুরি
কেন আরব লিগ ইসরায়েলের গণহত্যা থামাতে পারল না?
গাজার নুসেইরাতে শরণার্থী শিবিরের পাশে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছে উঁচু স্থানে বসে আছেন এক নারী। তার সামনে দৃশ্যমান যুদ্ধে বাস্তুহারাদের জন্য তৈরি আশ্রয়কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা তৃতীয় বছরে পা দিচ্ছে। এই আগ্রাসন এখন অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়া ও লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু নিজেদের সরকার ও আরব লিগের এমন রহস্যজনক নীরবতায় সাধারণ আরবরা বিস্মিত। তারা বুঝতে পারছে না কেন আরব দেশগুলো এতটা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল মূলত দুই পক্ষের। একদিকে পশ্চিমা ও বিশ্বশক্তিগুলো, অন্যদিকে আরব সরকারগুলো। কিন্তু তারা কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়িত্ব সারছে। মাঝেমধ্যে কিছু নামমাত্র ত্রাণ পাঠাচ্ছে তারা, আবার কখনও জাতিসংঘে বৈঠক ডাকছে। এসব উদ্যোগ আসলে তাদের সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ। বিশেষ করে আরব লিগ তো এখন ‘নিষ্ক্রিয়তার’ এক মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আরব স্বার্থ রক্ষার দাবি করলেও বাস্তবে কেবল ফাঁকা বুলি আউড়ে যাচ্ছে। কেন আরব বিশ্ব এমন নতিস্বীকার করে আছে, তার পেছনে তিনটি কারণ কাজ করছে।

প্রথম কারণটি হলো এই রাষ্ট্রগুলোর ঔপনিবেশিক ধাঁচের শাসনব্যবস্থা। আরব দেশগুলো কখনও ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই রাষ্ট্রগুলো গড়া হয়েছিল মূলত বিদেশি শক্তির স্বার্থ রক্ষার জন্য। সেখানে সাধারণ মানুষের পরিচয়, অধিকার কিংবা আকাঙ্ক্ষার কোনো মূল্য ছিল না।

এ কারণে ইরান বা তুরস্কের মতো শক্তিশালী অবস্থানে আরব দেশগুলো পৌঁছাতে পারেনি। তারা নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান ও জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তারা প্রতিনিয়ত শক্তিশালী দেশগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয়। বিদেশি রাজনৈতিক বা সামরিক হুমকি রুখে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের গড়ে ওঠেনি। এমনকি জ্বালানি সমৃদ্ধ সম্পদশালী আরব দেশগুলোও টিকে থাকার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল। অর্থ, অস্ত্র কিংবা প্রযুক্তির জন্য তারা অ-আরব দেশগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে।

গাজা গণহত্যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই অতিনির্ভরশীলতা তাদের সার্বভৌমত্বকে গ্রাস করেছে। তারা স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো শক্তির বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস তারা পাচ্ছে না। কারণ, তারা জানে এর মাশুল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

দ্বিতীয় কারণটি হলো আরব শাসকদের ভয়। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সুদানের বর্তমান বিধ্বস্ত দশা তাদের সামনে এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। নব্য-ঔপনিবেশিক প্রভু কিংবা ইসরায়েলের অবাধ্য হলে কী করুণ পরিণতি হতে পারে, এই রাষ্ট্রগুলো প্রতিদিন আরব নেতাদের সেই বার্তাই দিচ্ছে।

সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তিগুলোর কড়া নজরদারিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা কিংবা আর্থিক বলয় থেকে তারা বের হতে পারেনি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান, ইসরায়েল ও তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব। সব মিলিয়ে আরব দেশগুলো এখন নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ কৌশলে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে এক শক্তিশালী জাল বিস্তার করেছে। পানি, খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও সামরিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। সরাসরি সম্পর্কের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ন্যাটো এবং আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলোকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের অবাধ্য হওয়ার সাহস দেখায়, তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়। কোনো আরব দেশ যদি কেবল মিডিয়ায় ফাঁকা বুলি না ছেড়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের মোকাবিলা করতে চায়, তবে তাদের চরম মাশুল গুনতে হবে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে সামরিক হামলা—সবকিছুই তাদের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

আরব দেশগুলোর এই নীরবতার পেছনে তৃতীয় কারণটি হলো সরকার ও জনগণের মধ্যকার বিশাল দূরত্ব। অভ্যন্তরীণ নীতি হোক বা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু—জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের কাজের কোনো মিল নেই। আরব দেশগুলোতে এক ধরনের ‘স্বৈরতান্ত্রিক সামাজিক চুক্তি’ বজায় থাকে। এই চুক্তি অনুযায়ী, সরকার জনগণের খাদ্য, পানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে। বিনিময়ে নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় নীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক বা সুদানের মতো দেশগুলো এই চাহিদা মেটাতে পারছে না। সেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জাতিগত সংঘাত চরমে পৌঁছেছে। এই সুযোগে বিদেশি শক্তিগুলো সেখানে হস্তক্ষেপ করছে। ফলে অনেক রাষ্ট্র আজ ভাঙনের মুখে।

আমি গত ৬০ বছর ধরে এই আরব অঞ্চলে সাংবাদিকতা করছি। আমি নিশ্চিত, এখানকার সরকার, অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষ—সবাই ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা সবাই ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করতে চায়। কিন্তু গাজা গণহত্যা এবং লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি হামলা একটি কঠোর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। শাসক ও জনগণের অগ্রাধিকার আসলে ভিন্ন। যখন ফিলিস্তিনকে সমর্থন করা বনাম নিজেদের ক্ষমতা ও নিরাপত্তা রক্ষার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয়, তখন আরব শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাটাকেই বড় করে দেখেন। ফিলিস্তিনের স্বার্থের চেয়ে তাদের কাছে গদি রক্ষা করাটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গত অর্ধশতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে এক নব্য-ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা বন্ধুদের স্বার্থ রক্ষা করা। এখানে আরব রাষ্ট্র কিংবা নাগরিকদের অধিকারকে সবসময় তুচ্ছ করে দেখা হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় আরবরা বড়জোর প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিতে পারে, আঞ্চলিক বৈঠক করতে পারে কিংবা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে পারে। তারা চাইলে ত্রাণ পাঠাতে পারে, ফিল্ড হাসপাতাল বানাতে পারে কিংবা মাথায় কেফিয়াহ বেঁধে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়াতে পারে। এমনকি জাতিসংঘের ভোটে ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ারও অনুমতি আছে। কিন্তু কার্যকর কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অনুমতি নেই। যখনই কেউ সেই চেষ্টা করে, তখনই তাদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা গণহত্যা চালিয়ে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।

আরব লিগ এই নিয়মগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। কারণ এই সংস্থাটি আসলে আরব শাসকদেরই প্রতিচ্ছবি। এছাড়া আরব লিগের কাজের পদ্ধতিও একে পঙ্গু করে রেখেছে। ডাকমাশুল বা বিমান ভাড়া নির্ধারণের মতো তুচ্ছ বিষয় ছাড়া অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা একমত হতে পারে না। গাজা, লেবানন ও ইরান সংকটে আরব দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে না পারার আরেকটি কারণ আছে। ১৯৭৯ সাল থেকে বেশিরভাগ আরব সরকার ইরানকে তাদের প্রধান শত্রু মনে করে। তারা চায় না হিজবুল্লাহ, হামাস বা হুতিদের মতো প্রতিরোধ যোদ্ধারা শক্তিশালী হোক। কারণ এই গোষ্ঠীগুলো ইরানের ঘনিষ্ঠ। এই আশঙ্কাই আরব দেশগুলোকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখছে।

তবে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। আরব দেশগুলোকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ‘নিরাপত্তা কবচ’ বা ছাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা আসলে বেশ নড়বড়ে। এই যুদ্ধের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আগামী বছরগুলোতে আরব সরকারগুলো হয়তো তাদের নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ নতুন করে করবে। একটি সত্যিকারের নিরাপদ এবং পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ার জন্য তারা হয়তো তাদের পুরোনো নীতি বদলে ফেলবে।


আল জাজিরা থেকে অনূদিত

লেখক: রামি জি খুরি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের ডিস্টিংগুইশড পাবলিক পলিসি ফেলো। তিনি আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি’র একজন অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো। লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবেও তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে।