বিতর্কের দুই বছর পর ট্রাম্পকে বাইডেনের খোঁচা, ‘উনি তো ব্যর্থ মানুষ!’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শনিবার রাতে ম্যারিল্যান্ডের এক দলীয় তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ডেমোক্র্যাটদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। এ সময় হোয়াইট হাউসে তার উত্তরসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। বাইডেন তাকে ‘অহংকারী’ ও ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বাইডেন বলেন, ‘এটি কেবল তার বিলাসিতার প্রকল্প নয়। তিনি নিজের বলরুম তৈরির জন্য হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙেছেন। কেনেডি সেন্টারে নিজের নাম বসিয়েছেন। নিজের সম্মানে তোরণ নির্মাণ করিয়েছেন। এমনকি রিফ্লেক্টিং পুল মেরামতের জন্য নিজের লোক নিয়োগ করেছেন। তিনি একজন ব্যর্থ মানুষ (লুজার)!’
বাইডেন আরও বলেন, ‘রিফ্লেক্টিং পুলটি এই প্রশাসনের মূলে থাকা আত্মমুগ্ধতা ও অযোগ্যতার চেয়েও খারাপ কিছু প্রতিফলিত করছে। তা হলো দুর্নীতি। এটি এক নির্লজ্জ ও প্রকাশ্য দুর্নীতি। আমেরিকার ইতিহাসে কোনো প্রশাসনেই এমন মাত্রার দুর্নীতি আগে কখনো দেখা যায়নি।’
হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা বাইডেনের অন্যতম কঠোর সমালোচনা ছিল এই ১০ মিনিটের ভাষণ। ঠিক দুই বছর আগে এই দিনেই সিএনএনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি বিতর্কে ট্রাম্পের মুখোমুখি হয়েছিলেন বাইডেন।
ওই মুহূর্তটিই ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে দেয়।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বাইডেন বলেন, ‘আমাকে যা রাগান্বিত করে তা হলো— ট্রাম্প ৬ জানুয়ারির দাঙ্গাকারীদের করদাতার টাকা, অর্থাৎ আপনাদের টাকা দিতে চান। তিনি এটাই করতে চাইছেন। এই লোকগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জেলে থাকা উচিত।’
হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ট্রাম্পের সমালোচনা করতে পিছুপা হননি বাইডেন। গত এক মাসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ডেমোক্র্যাটদের ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি ম্যারিল্যান্ড, সাউথ ডাকোটা এবং তার নিজ রাজ্য ডেলাওয়্যারের দলীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।
তবে বাইডেনের বর্তমান সময়টি বেশ জটিল যাচ্ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার ভূমিকা নিয়ে নিজের দলের মধ্যেই অনেকে হতাশ। এসএসআরএস পরিচালিত সিএনএনের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বাইডেনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এটি তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম।
বাইডেনের এই ভাষণের পাশাপাশি তার পরিবারের রাজনীতিতে পুনরায় সরব হওয়া নিয়েও কিছু ডেমোক্র্যাট বিরক্ত। সাবেক ফার্স্ট লেডি ড. জিল বাইডেন সম্প্রতি তার স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন। বইটির প্রচারণামূলক সফরে গিয়ে তিনি ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের মত দিচ্ছেন। অনেক ডেমোক্র্যাট মনে করেন, এর মাধ্যমে দলের পুরনো ক্ষতগুলো পুনরায় উন্মোচিত হচ্ছে।
বাইডেনের সাবেক মুখপাত্র এবং তার অন্যতম কড়া সমর্থক অ্যান্ড্রু বেটস নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের জেতার দায়িত্ব ছিল, কিন্তু আমরা পারিনি। আমি সব সময় এটি নিয়ে ভাবি। তবে দলের জন্য সেই বেদনাদায়ক আলোচনাটি এখনই প্রকাশ্যে পুনরায় শুরু করার কেন প্রয়োজন ছিল, তা আমি বুঝতে পারছি না।’
ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের বইয়ের প্রচারণা অনুষ্ঠানে এই মন্তব্যের জেরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক ফার্স্ট লেডি। জিল বাইডেন পাল্টা জবাবে বলেন, ‘আমাকে ফোন দিন এবং সরাসরি আমার সামনে কথাটি বলুন।’
তার এই প্রতিক্রিয়া সাবেক অনেক সহকর্মীর সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, জিল বাইডেন এবং অ্যান্ড্রু বেটস পরদিন এ নিয়ে কথা বলেছেন।
বাইডেন-পুত্র হান্টার এখন সব জায়গায় সরব। তাকে সব বিষয়েই কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারী সংখ্যাও অনেক। যেমন ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) তার অনুসারী সংখ্যা আট লাখের বেশি।
সেখানে তিনি নিয়মিত মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে তার অতীত লড়াইয়ের গল্প এবং রাজনীতি নিয়ে নিজের ভাবনা পোস্ট করেন। তিনি দীর্ঘ পডকাস্ট সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন। এর মধ্যে বিতর্কিত রক্ষণশীল পডকাস্টার ক্যান্ডাস ওয়েন্সের সঙ্গে দুই ঘণ্টার একটি আলাপচারিতা উল্লেখযোগ্য।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামের পডকাস্টে হান্টার তার বাবার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। আগে ক্ষমা করবেন না বলে জানালেও শেষ পর্যন্ত জো বাইডেন তার ছেলেকে ক্ষমা করে দেন।
এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে হান্টার বলেন, ‘তিনি নিজের ঐতিহ্যের (লিগ্যাসি) চেয়ে আমাকে বেছে নিয়েছেন। কারণ লোকে যাই বলুক না কেন, তাকে নিয়ে যখন ইতিহাস লেখা হবে, তখন প্রথম সারিতেই এই বিষয়টি থাকবে।’
বাইডেনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা আগামী মাসগুলোতে আরও জোরালো হতে পারে। তিনি বছরের অনেকটা সময় তার স্মৃতিকথা (মেমোয়ার) লেখার পেছনে ব্যয় করেছেন।
তবে এটি প্রকাশের দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তার প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির কাজও তার পূর্বসূরিদের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে শুরু হয়েছে। এটি ডেলাওয়্যারে হবে বলে বাইডেন জানিয়েছেন। তবে এখনো নির্দিষ্ট কোনো জায়গা চূড়ান্ত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শিগগিরই এই বিষয়গুলো চূড়ান্ত হতে পারে।
বাইডেনের টিম লাইব্রেরির জন্য তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। তবে বারাক ওবামার শিকাগোভিত্তিক ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টারের তুলনায় বাইডেনের লাইব্রেরি আকারে অনেক ছোট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহেই ওবামার সেই সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বাইডেন।
বাইডেনের বয়স এখন ৮৩ বছর। তিনি বর্তমানে প্রস্টেট ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছেন। ক্যান্সার এখন তার হাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হোয়াইট হাউস ছাড়ার কয়েক মাস পর এই রোগ ধরা পড়ে।
এরপর থেকে তিনি রেডিয়েশন ও হরমোন থেরাপি নিচ্ছেন। জিল বাইডেন সম্প্রতি এনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার মনে হয় জো-কে সারা জীবন ক্যান্সার নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।’
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কোনো কোনো অংশ থেকে তাকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তা সত্ত্বেও সুযোগ পেলেই বাইডেন দলকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।
প্রাইমারি নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি তার প্রশাসনের দুই সাবেক কর্মকর্তার প্রতি সমর্থন জানান। তারা হলেন জর্জিয়ার গভর্নর পদপ্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস এবং ম্যাসাচুসেটসের কংগ্রেস প্রার্থী ড্যান কোহ।
শনিবার ম্যারিল্যান্ডের অনুষ্ঠানে বাইডেন গভর্নর ওয়েস মুর এবং সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনের সঙ্গে দেখা করেন। এই দুই ডেমোক্র্যাট নেতাকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ওয়েস মুর বাইডেনকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি স্মরণ করেন, ২০২৪ সালে বাল্টিমোরের ফ্রান্সিস স্কট কি সেতু ভেঙে পড়ার পর বাইডেন কীভাবে উদ্ধার তৎপরতায় লাখ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন।
মুর বলেন, ‘তিনি কেবল পুনর্নির্মাণে নয়, আমাদের শোক কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করেছেন। তিনি শহরটিতে দ্রুত ফেডারেল সম্পদ পাঠিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন লাখ লাখ মানুষ এর ওপর নির্ভর করছে। বাইডেন জন্মসূত্রে ম্যারিল্যান্ডের মানুষ না হতে পারেন, কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন ম্যারিল্যান্ডবাসী কতটা শক্ত আর বাল্টিমোর কতটা শক্তিশালী।’
বাল্টিমোরের ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাড্রিয়েন গ্রিন ভাষণের আগে বাইডেনের সঙ্গে দেখা করেন। তার সঙ্গে দেখা করে অ্যাড্রিয়েন আনন্দিত। তার মতে, বাইডেন এই বয়সেও ‘বেশ ভালো’ আছেন। তবে তিনি দুই দলেই নতুন নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি তারা (সাবেক নেতারা) মূল্যবান পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলেই এমন সময় এসেছে যখন নতুন প্রজন্মের হাতে মশাল তুলে দেওয়া প্রয়োজন।’
ডেলাওয়্যারের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি সারাহ ম্যাকব্রাইডের সঙ্গে বাইডেনের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। গত সপ্তাহেও তারা ডেলাওয়্যারে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। তখন তারা বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
ম্যাকব্রাইড ফোনে সিএনএনকে বলেন, ‘ভোটাররা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমার মনে হয় আমাদের এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা দরকার। এতে জো বাইডেন, বারাক ওবামাসহ আমাদের দলের সাবেক নেতাদেরও শামিল করা উচিত। বাইডেনের নেতৃত্বের জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ।’
শনিবার ডেমোক্র্যাটদের সামনে দাঁড়িয়ে বাইডেন দৃঢ়ভাবে বলেন যে তিনি এখনো দলের জন্য ‘লড়াই করছেন’। ক্ষমতার বাইরে থাকা ডেমোক্র্যাটদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যারা আমাদের দেশকে ভালোবাসেন, তাদের প্রতি আমার বার্তা স্পষ্ট ও সহজ— উঠে দাঁড়ান। এখনই সময়। এই লড়াই চালিয়ে যান!’ তাঁর এই আহ্বানে উপস্থিত সবাই করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।
লেখক পরিচিতি: তিনি সিএনএনের সাংবাদিক হিসেবে বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে কর্মরত।





