১৯৬ উপজেলায় চিকিৎসকের তীব্র সংকট, ভোগান্তিতে রোগীরা
• ৪৯২ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকদের ৫১ শতাংশ পদ শূন্য
• সবচেয়ে বেশি সংকট খুলনা বিভাগে
• সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম ও নোয়াখালীসহ ১৩ জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই সংকট
• এলাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় ঢাকামুখী হচ্ছেন রোগীরা

দেশের অর্ধেকেরও বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। এতে ব্যাহত হচ্ছে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা, চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশের ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালে ১৬ হাজার ৭৮৪টি পদের মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ হাজার ৪৫২টি পদই ফাঁকা পাওয়া গেছে। এটি মোট পদের প্রায় ৫১ শতাংশ।
৫১টি জেলার ১৯৬টি উপজেলায় এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের ৩৪টি উপজেলায় সংকট সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে কম রাজশাহী বিভাগে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে বন্ধ বেশিরভাগ রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, মিলছে না প্রয়োজনীয় ওষুধও।
বরগুনার আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেটিস্টসহ চিকিৎসকের ৩৯টি পদের মধ্যে ২৪টিই শূন্য, শতকরা হিসাবে যা ৬২ শতাংশ। শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির জনবলের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। তাদের মধ্যে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অথচ স্থানীয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে।
নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সজীব ঘোষ জানান, হাসপাতালটিতে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি বিভাগে কনসালটেন্ট নেই। তিনি বলেন, ‘শুধু চিকিৎসক নয়, অন্যান্য জনবলেরও তীব্র সংকট রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়ে সেবা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’
৫১ জেলায় সংকট
উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট শুধু আমতলী বা নিকলীতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ২০০টি উপজেলায় চিকিৎসকের অভাবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এসব উপজেলায় হাতেগোনা চিকিৎসক রয়েছেন। পদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই শূন্য। অধিকাংশ উপজেলায় বন্ধ রয়েছে বেশির ভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিছু ওষুধ পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে না পারা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থার অভাব, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের গ্রামে না থাকা এবং দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থার কারণে দাঁড়াতে পারছে না উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা। আর শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
সম্প্রতি উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকটের তথ্য নিতে সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। সে অনুযায়ী প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আট বিভাগের ৫১ জেলার ১৯৬টি উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুগছে খুলনা বিভাগের নয় জেলার ৩৪টি উপজেলা। সবচেয়ে কম সংকট রাজশাহী বিভাগে।
এর বাইরে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২০টি, চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলায় ২৪টি, ঢাকা বিভাগের আট জেলায় ২৯টি, ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ২০টি, রাজশাহী বিভাগের চার জেলায় ১২টি, রংপুর বিভাগের সাত জেলায় ৩১টি এবং সিলেট বিভাগের চার জেলার ২৬টি উপজেলায় ব্যাপক চিকিৎসক সংকট রয়েছে।
যেসব উপজেলায় সংকট
খুলনা বিভাগ: এই বিভাগের ৩৪ উপজেলার মধ্যে রয়েছে খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, রূপসা, তেরখাদা ও ডুমুরিয়া উপজেলা। রয়েছে বাগেরহাটের চিতলমারী, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল ও শরণখোলা উপজেলা। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলা। যশোরের অভয়নগর, বাঘারপাড়া, কেশবপুর ও শার্শা উপজেলা। এ ছাড়া ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলা; মাগুরার মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলা; মেহেরপুরের গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা; নড়াইলের কালিয়া উপজেলা; সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, দেবহাটা, শ্যামনগর ও তালা উপজেলা এবং কুষ্টিয়ার খোকসা, কুমারখালি ও মিরপুর উপজেলা।
বরিশাল বিভাগ: এই বিভাগের ২০ উপজেলার মধ্যে রয়েছে বরগুনার আমতলী, বামনা, বেতাগী, পাথরঘাটা ও তলতলী উপজেলা। ভোলার বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, লোলমোহন, মনপুরা ও তজুমুদ্দিন উপজেলা। বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলা। এ ছাড়া ঝালকাঠির নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা এবং পটুয়াখালীর গলাচিপা, পিরোজপুরের কাউখালী, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুর উপজেলা।
চট্টগ্রাম বিভাগ: এই বিভাগের ২৪ উপজেলার মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও বিজয়নগর উপজেলা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও রুমা উপজেলা। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও ও উখিয়া উপজেলা। খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও গুইমারা উপজেলা। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও রামগঞ্জ; নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চাটখিল, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, সেনবাগ ও সুবর্ণচর উপজেলা; রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, লংগদু ও নানিয়ারচর উপজেলা এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলা।
ঢাকা বিভাগ: এই বিভাগের ২৯ উপজেলার মধ্যে রয়েছে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা, ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন, নগরকান্দা ও সালথা। গাজীপুরের কালীগঞ্জ। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, করিমগঞ্জ, কটিয়াদি, মিঠামাইন, নিকলী, পাকুন্দিয়া ও তাড়াইল। এ ছাড়া মাদারীপুরের শিবচর ও ডাসার; রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ, কালুখালী ও পাংশা; শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও নড়িয়া এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, কালিহাতী, মধুপুর ও সখিপুর।
ময়মনসিংহ বিভাগ: এই বিভাগের ২০ উপজেলার মধ্যে জামালপুরের সবকটি উপজেলা—বকশিগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ি রয়েছে সংকটের তালিকায়। এ ছাড়া রয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকা, ফুলপুর, গফরগাঁও, হালুয়াঘাট, ঈশ্বরগঞ্জ ও নান্দাইল; নেত্রকোনার আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, মদন ও পূর্বধলা এবং শেরপুরের নকলা, নালিতাবাড়ী ও শ্রবরদী।
রাজশাহী বিভাগ: এই বিভাগের ১২ উপজেলার মধ্যে রয়েছে বগুড়ার আদমদিঘী, ধুনট, দুপচাঁচিয়া, গাবতলী, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা। এ ছাড়া রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট; জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও কালাই; নওগাঁর মান্দা ও মহাদেবপুর এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা হাসপাতাল।
রংপুর বিভাগ: এই বিভাগের ৩১ উপজেলার মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বীরগঞ্জ, বিরল, বোচাগঞ্জ, চিরিরবন্দর, ঘোড়াঘাট, খানসামা ও পার্বতীপুর উপজেলা হাসপাতাল। রয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের চিলমারী, নাগেশ্বরী, রাজারহাট, চর রাজিবপুর, রৌমারী ও উলিপুর; লালমনিরহাটের আদিতমারী ও হাতিবান্ধা; নীলফামারীর ডোমার, জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা; পঞ্চগড়ের আটোয়ারী, বোদা, দেবীগঞ্জ ও তেতুলিয়া উপজেলা; রংপুরের পীরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর ও রাণীশংকৈল উপজেলা।
সিলেট বিভাগ: এই বিভাগের ২৬ উপজেলা হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ, বাহুবল, বানিয়াচং, চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা। রয়েছে মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা। এ ছাড়া সিলেটের বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা হাসপাতাল এবং সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর, দিরাই, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলা হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার, আবাসিক কর্মকর্তা, সার্জন, সহকারী সার্জন, অ্যানেসথেসিস্ট ও প্যাথোলজিস্টসহ ১৬ হাজার ৭৮৪ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবে, ৮ হাজার ৪৫২টি পদই ফাঁকা। শতকরা হিসাবে এই হার প্রায় ৫১ শতাংশ।
শহরমুখী রোগীরা
দেশজুড়ে চিকিৎসক সংকটে বাড়ছে ঢাকামুখী রোগীর চাপ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে না পেরে উপজেলা হাসপাতাল থেকে ফেরত আসা রোগীরা ছুটছেন জেলা সদর কিংবা বিভাগীয় হাসপাতালে। তবে সেখানেও রোগীর তুলনায় জনবল ও বরাদ্দসহ নানা সীমাবদ্ধতায় মানসম্মত চিকিৎসা মিলছে না। ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় রাজধানীতে ভিড় করছেন রোগীরা, এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল গাফফার মিয়া। ৫৫ বছর বয়সী এই কৃষকের পেটে পানি জমেছে, দ্রুত বাড়ছে ওজন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ছয় দিন কেটে গেলেও মেলেনি শয্যা। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে তোশক বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
শুধু আব্দুল গাফফার নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের উপচেপড়া ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই ঢাকা মেডিকেলে।
দেশের সর্ববৃহৎ এই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে দুই হাজার ৬০০ শয্যাবিশিষ্ট। তবে প্রতিনিয়ত দ্বিগুণের বেশি ভর্তি রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকায় যখন শয্যা না পেয়ে আব্দুল গাফফার যখন মেঝেতে কাতরাচ্ছেন, সেই সময়ে তার নিজ উপজেলা রায়পুরার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খালি থাকছে শয্যা। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দিনে গড়ে ভর্তি থাকেন ৪০ থেকে ৪১ জন রোগী।
ঢাকা মেডিকেলে গত ৩০ আগস্ট কথা হয় আব্দুল গাফফারের ছেলে রিয়াজ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালে ঠিকমতো ডাক্তার থাকেন না, সেখানে চিকিৎসা পায় না রোগীরা। সদর হাসপাতালে গেলে উনারা না দেখে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। পরে প্রাইভেটে পরীক্ষা করালে ক্যানসার ধরা পড়ে, তাই এখানে নিয়ে এসেছি। কিন্তু ভর্তি করালেও এখনও বেড মেলেনি।’
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্রও করুণ। প্রায় ছয় লাখ মানুষের ভরসা ৫০ শয্যার এই উপজেলা হাসপাতাল। কাগজে-কলমে জনবল রয়েছে ৩১ শয্যার হিসাবে।
এখান থেকে লোকজন কেন শহরমুখী হচ্ছেন? এ নিয়ে কথা হয় রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে। তারা জানান, উপজেলা হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় শহরমুখী হচ্ছেন রোগীরা।
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রংপুর মেডিকেলে পাঠানো হয় মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রহিমকে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বুকে ব্যথা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সযোগে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হই। পরীক্ষা না করেই হৃদরোগ মনে করে রংপুর মেডিকেলে পাঠান চিকিৎসক। তাহলে উপজেলা হাসপাতাল থেকে কী লাভ?’
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মীর হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো অবস্থা নেই এখানে। ফলে গুরুতর ও সংকটাপন্ন রোগী এলে তাদের বিভাগীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
রংপুরের আট উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধাসহ বিভাগের অন্যান্য জেলার রোগী সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল।
কাগজে-কলমে এক হাজার শয্যার হলেও উত্তরবঙ্গের প্রধান এই চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন ভর্তি থাকে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী, যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ। অথচ জনবল রয়েছে এক দশক আগের ছয়শ শয্যার হিসাবে।
সক্ষমতার বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে ওষুধ থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়— কোনো ক্ষেত্রেই চাহিদা মেটাতে পারছে না স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি।
রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘বাজেট ও আর্থিক স্বল্পতায় সব ওষুধ দিতে পারি না। লোকবলের অভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রিয়েজেন্ট (পরীক্ষার উপাদান) থাকা সত্ত্বেও সব টেস্ট ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা সম্ভব হয় না। কিছুটা সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়।’
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য জেলায় যেমন ২৫০ বা ৫০০ শয্যার সদর হাসপাতাল থাকে, রংপুরে তেমন নেই। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি টারশিয়ারি বা রেফারেল হাসপাতাল, যেখানে শুধু জটিল রোগীদের আসার কথা। কিন্তু সদর হাসপাতাল না থাকায় অন্য রোগীরাও আসছেন।’
উপজেলায় ৮০ ভাগ রোগী মামলা-সংক্রান্ত
চিকিৎসকের সংকট থাকলেও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। মাঝেমধ্যে শয্যা ফাঁকা থাকলেও প্রায়ই শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। সরেজমিনে কিছু রোগীর বিষয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন কারণ।
নরসিংদীর রায়পুরা ও রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভর্তি রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই জমিজমা বা পারিবারিক মারামারি সংক্রান্ত মামলার জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট নিতে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। অনেক সময় সুস্থ হয়ে উঠলেও থানা-পুলিশ বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ছাড়পত্র নিতে চান না রোগী।
নরসিংদীর রায়পুরা ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতাল। উপজেলার ছয় লাখের বেশি মানুষের এই চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর তীব্র চাপ থাকার কথা থাকলেও উল্টো শয্যা ফাঁকা থাকে এখানে।
রোগীদের একজন উপজেলার উত্তর বাখরনগরের বাহাদুরপুর এলাকার নবী হোসেন জানান, জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষের আঘাতে আহত হয়েছেন তিনি। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছে।
হাসপাতালের নার্স ইনচার্জ আফরোজা সুলতানা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যত রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি থাকে তার ৮০ ভাগই কোনো কোনো মামলা সংক্রান্ত, পুলিশ কেসের।’
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েও রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে একই রকমের চিত্র মিলেছে। সেখানে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৮০ ভাগই মারামারি-সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
উপজেলার লতিবপুর থেকে আসা রোগী রিপন মিয়া বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব। ভাই, ভাবি, ভাতিজাদের সঙ্গে মারামারি করে ভর্তি হয়েছি। থানায় অভিযোগ দিয়েছি। মামলা করতে মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে। এজন্য ভর্তি হয়েছি।’
মিঠাপকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সোমা প্রামাণিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অধিকাংশ রোগী দ্বন্দ্ব, মারামারি তথা মামলা সংক্রান্ত। অনেককে ছাড়পত্র দিলেও বাড়িতে যেতে চান না।’
শয্যা বাড়ানোই সমাধান নয়
চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল ও খাতভিত্তিক বরাদ্দ না বাড়লেও প্রান্তিক পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে ৩০ ও ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৩ জুন সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ কথা জানান।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিক জনসমাবেশে তার সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। তবে জনবল ও বাজেট না বাড়িয়ে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ‘অর্থহীন’ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘উপজেলায় অবকাঠামো বড় করে দালান বানালেও ডাক্তার না থাকলে তা তাজমহলের মতো খালি পড়ে থাকবে। আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব মনে করেন, হাসপাতালগুলোতে শুধু শয্যা বাড়িয়ে, ভবন তুলে বা চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, ‘নতুন শয্যা বাড়ালে বাড়তি বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ লাগবে। চিকিৎসকদের বসার জায়গা লাগবে। পর্যাপ্ত লোকবল প্রয়োজন হবে। যেখানে বিদ্যমান পোস্টগুলোতেই চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে শয্যা বাড়িয়ে নতুন লোকবল কোথা থেকে আসবে?’
এ অবস্থায় পুরো দেশে ঢালাওভাবে শয্যা না বাড়িয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ বিএমএর এই সাবেক সভাপতির। তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইলে আগে অন্তত দুই থেকে চারটি উপজেলা হাসপাতালে এটি শতভাগ কার্যকর করে দেখাতে হবে। সেবা দেওয়ার সামগ্রিক সামর্থ্য না বাড়িয়ে কেবল ফাঁকা বেড ও দালানকোঠা বাড়ানো পুরোপুরি অর্থহীন।’
নতুন নিয়োগে সমাধান দেখছে সরকার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও সেখানে জনবল ৫০ শয্যার, আবার আড়াইশ শয্যার হাসপাতাল চলছে ১০০ শয্যার জনবলে। উপজেলা পর্যায়ে গড়ে অর্ধেক পদ ফাঁকা। এর মধ্যে তীব্র জনবলের অভাব রয়েছে এমন ৮০টি উপজেলা হাসপাতাল আমরা চিহ্নিত করেছি।’
চিকিৎসকের সংকট যখন পাহাড় সমান সেখানে ৪৮তম বিসিএসে নতুন মাত্র ১৮৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তাদের পদায়ন করা হয়।
স্বাস্থ্যমস্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার সংসদে জানান, সারা দেশে সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৩১১ জন। চিকিৎসকের শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৯৫টি।
মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসক দরকার। সরকারের চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।’
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর ও নরসিংদী প্রতিনিধি।



