logo
Advertisement
নীতিমালা নেই, দাম বাড়ছে ইচ্ছেমতো

একই টেস্টে পাঁচ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ রকম দাম, বিপাকে রোগীরা

একই টেস্টে পাঁচ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ রকম দাম, বিপাকে রোগীরা
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য নির্ধারণে কোনো সরকারি নীতিমালা নেই। এই সুযোগে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো দাম ঠিক করছে। গত তিন বছরে বেশিরভাগ পরীক্ষায় খরচ বেড়েছে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত। একই টেস্টে সমমানের পাঁচ প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয় পাঁচ রকম দাম।

Advertisement

এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা। অরাজকতা থামাতে ২০২০ সালে সরকার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিলেও ছয় বছর পরও তা আলোর মুখ দেখেনি।

রাজধানীর ল্যাব এইড, পপুলার, ইবনে সিনা, আইসিডিডিআর,বি, আনোয়ার খান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও লাইফ কেয়ার মেডিকেল সেন্টার। রোগ নির্ণয়ের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রায় একই রিএজেন্ট, যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহার হলেও এগুলোর অধিকাংশ পরীক্ষার দামে বেশ তফাত রয়েছে। এমনকি একই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায়ও দামের তারতম্য রয়েছে।

রক্তে কোলেস্টেরল ও চর্বির পরিমাণ জানতে ব্যবহৃত লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষায় ল্যাব এইডে দাম এক হাজার ৫০০ টাকা। পপুলারে এক হাজার ৪০০, আইসিডিডিআর,বিতে এক হাজার ২৬০, লাইফ কেয়ারে এক হাজার ৩০০ এবং ইবনে সিনায় মাত্র ৯০০ টাকা।

অ্যান্টিবডি পরীক্ষা আইজিজি ও আইজিএমে দামের পার্থক্য অন্তত ৮০০ টাকা। ল্যাব এইডে এক হাজার ৭৮০, পপুলারে এক হাজার ৫০০, আইসিডিডিআর,বিতে এক হাজার ৪০০ এবং লাইফ কেয়ারে দেড় হাজার টাকা।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় করা এন্ডোস্কোপিতে চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দামের ব্যবধান আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। ইবনে সিনায় এক হাজার ৮০০, লাইফ কেয়ারে দুই হাজার ৪০০, আনোয়ার খান মডার্নে দুই হাজার ৫০০ এবং পপুলারে তিন হাজার টাকা। আইসিডিডিআর,বিতে চার হাজার ৫০০ টাকা হলেও বর্তমানে সেখানে পরীক্ষাটি বন্ধ রয়েছে।

প্রেগনেন্সি আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ল্যাব এইড নিচ্ছে তিন হাজার ৭০০ টাকা, আনোয়ার খান মডার্নে তিন হাজার ৩০০, আইসিডিডিআর,বিতে দুই হাজার ৪০০, পপুলারে দুই হাজার ৫০০ এবং ইবনে সিনায় এক হাজার ৫০ টাকা।

হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক কার্যক্রম নির্ণয়ে ব্যবহৃত এনটি-প্রো বিএনপি পরীক্ষায় আইসিডিডিআর,বিতে তিন হাজার, ল্যাব এইডেও তিন হাজার, পপুলারে তিন হাজার ৬৯০ এবং লাইফ কেয়ারে চার হাজার ৫০০ টাকা।

কোলনস্কোপিতে দামের ব্যবধান আরও বেশি। স্কয়ার, ইউনাইটেড ও এভারকেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই পরীক্ষায় গুনতে হয় ১৮ হাজার টাকা। ইবনে সিনা ও লাইফ কেয়ারে ছয় হাজার, আনোয়ার খান মডার্নে নয় হাজার, পপুলারে নয় হাজার ৫০০ এবং ল্যাব এইডে ১২ হাজার টাকা।

ব্রেনের সিটি স্ক্যানে এমএমজেড, লাইফ কেয়ার ও ইবনে সিনায় চার হাজার টাকা হলেও পপুলারে পাঁচ হাজার এবং ল্যাব এইডে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। বুকের এক্স-রে আইসিডিডিআর,বিতে ৮০০ টাকা, ল্যাব এইড, পপুলার ও লাইফ কেয়ারে ৬০০ এবং এমএমজেড হাসপাতালে ৫০০ টাকা।

গলা ও বুকের এমআরআই, ইসিজি, ইউরিন অ্যামাইলেস, পুরো শরীরের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও বিলিরুবিনসহ অন্যান্য পরীক্ষায়ও দামের ব্যাপক তারতম্য পাওয়া গেছে। শুধু শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, বনশ্রীর ফরাজী হাসপাতাল, কলেজ গেটের ভিক্টোরিয়া হেলথকেয়ার লিমিটেড ও ট্রমা সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই চিত্র।

ভোগান্তি রোগীদের

দীর্ঘদিন ধরে পিত্তথলির সমস্যায় ভুগছেন হকার মো. রেজাউল ইসলাম (৪০)। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এই বাসিন্দা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখালে চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও সিবিসিসহ বেশকিছু পরীক্ষা দেন। পরীক্ষাগুলো ওই হাসপাতালে থাকলেও তাকে পাঠানো হয় ধানমন্ডির ল্যাব এইড হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

রেজাউল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিউমার্কেটের পাশে ভ্যানে কাপড় বিক্রি করি। অনেকটা দিনে এনে, দিনে খাওয়ার মতো অবস্থা। হাসপাতালে গেলে ডাক্তার বললেন সমস্যা জানতে হলে দ্রুত রিপোর্ট লাগবে। তাই এখানে (ল্যাব এইডে) পাঠিয়েছেন। পাঁচটা পরীক্ষা দিয়েছে, টাকা লাগছে চার হাজারের বেশি। কী রোগ হয়েছে সেটা জানতেই যদি এত টাকা যায়, তাহলে চিকিৎসা কীভাবে শুরু করব? পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?’

রেজাউলের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয় দেশের লাখ লাখ রোগীকে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত সুযোগ ও নানা সংকটের কারণে প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। আর এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

তিন বছরে ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত

ডায়াগনস্টিক সেন্টার সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরীক্ষার মূল্য ঠিক করছে। ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অধিকাংশ পরীক্ষায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

দুই বছর আগে ল্যাব এইডে প্রেগনেন্সি আল্ট্রাসনোগ্রাফির দাম ছিল তিন হাজার ৫২০ টাকা, এখন তিন হাজার ৭০০। ব্রেনের সিটি স্ক্যান পাঁচ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কোলনস্কোপি ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ছিল নয় হাজার ৫০০ টাকা, এখন ১০ হাজার।

কলেজ গেটের ভিক্টোরিয়া হেলথকেয়ার লিমিটেডের মার্কেটিং ম্যানেজার আল সালেহ আব্দুল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রিএজেন্টসহ নানা বাস্তবতায় গত তিন বছরে টেস্টভেদে চার থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে। শুধু আমরা বাড়িয়েছি এমন নয়। পাশের পপুলারসহ অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হয়েছে।’

নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘নীতিমালা থাকলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়। এতে করে যে কেউ ইচ্ছে করলেই দাম বাড়াতে পারবে না। রোগীদেরও কষ্ট কমবে।’

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ধানমন্ডি শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক অচিন্ত কুমার নাগ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দাম বাড়লেও একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়েনি। কয়েক বছর আগে সমন্বয় করা হয়েছিল। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। অন্যান্য খরচ বেড়ে গেলে দাম বাড়াবে কি না, কর্তৃপক্ষ দেখবে।’

বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিওএ) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন ল্যাব এইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম। দাম বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিবছর বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য সব খরচ ছয় থেকে আট শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। সেক্ষেত্রে টেস্টের দাম চার থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারের কোনো সহযোগিতা নেই। সরকার জমি কিংবা বিনা সুদে লোন দেয় না। সবই নিজেদেরই করতে হয়। আগে যে নার্সের বেতন শুরুতে ছিল চার হাজার টাকা, এখন দিতে হচ্ছে ২২ হাজার টাকা।’

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা টেনে ডা. শামীম বলেন, ‘সিঙ্গাপুর, ভারত ও থাইল্যান্ডের সমমানের হাসপাতালগুলোতে টেস্টের দাম বাংলাদেশের তুলনায় দুই থেকে দশ গুণ বেশি।’

নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ কত দূর

রোগ নির্ণয়ের দাম নিয়ন্ত্রণে ২০২০ সালে উদ্যোগ নেয় সরকার। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দুই দফা সভা করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সভায় দ্রুত নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং এ সংক্রান্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু গত ছয় বছরেও সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

ওই কমিটির সদস্য ছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হাসপাতালগুলোর ক্যাটাগরি করা এবং টেস্টের দাম নির্ধারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা সভা হয়েছে। কোন কোন পরীক্ষায় মূল্য অস্বাভাবিক রাখা হচ্ছে সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই একটি তালিকা করা হয়েছে। বর্তমানে এটি অধিদপ্তরে রয়েছে। এটাকে সমন্বয় করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের নীতিমালা থাকার কথা। বিস্তারিত জেনে বলতে পারব।’

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিমালা থাকা উচিত। তবে বিষয়টির ব্যাপারে আমার এখনও অজানা। অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করব।’

সমাধান কোন পথে

নীতিমালার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ডা. এ এম শামীম বলেন, ‘গ্রামে একটা এক্স-রে মেশিন পাঁচ লাখ টাকায় চীন থেকে আনা হয়। যন্ত্রটা একই হলেও আমরা কিন্তু দুই কোটি টাকায় আরও ভালো মানের মেশিন নিয়ে আসি। কাজেই সব প্রতিষ্ঠানে সমান দাম হবে না। এজন্য দামের বিষয়টি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। আর দামের চেয়ে সরকারের তরফে মানের দিকে নজর দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে তারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ, বি ও সি ক্যাটাগরি করে দিতে পারে। এতে করে মান অনুযায়ী দাম ঠিক করা সহজ হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মান ও দামের দিকে অবশ্যই সরকারের নজর রাখতে হবে।’

রোগীদের একটি বড় অংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলো চিকিৎসা নিতে গিয়ে আরও বিপাকে পড়েন। ফলে দাম বাড়বে, কিন্তু সেটার যৌক্তিকতা থাকতে হবে।’

স্বাস্থ্যসেবাকে মুক্তবাজারে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা যেহেতু মানুষের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়, তাই এটিকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকার দাম নির্ধারণ করার আগে সিস্টেমের উন্নতি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের লাভের দিক যেমন দেখতে হবে, একই সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদেরও কাঙ্ক্ষিত সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দরকার মান অনুযায়ী ক্যাটাগরি করা।’