উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় কমছে না হামের প্রকোপ

দেশব্যাপী হামের প্রকোপ ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। তবে লক্ষ্যমাত্রার বেশি টিকা দেওয়া হলেও দেড় মাস পরও ‘উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ’ অনেক উপজেলায় কমছে না রোগীর সংখ্যা। এখনও দৈনিক গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী সরকারি হাসপাতালে আসছে। বেসরকারি হাসপাতালের হিসাব যোগ করলে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, টিকাদানের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে হামের সংক্রমণ শূন্যের কোটায় নেমে আসা বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, টিকার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু এবার বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু জায়গায় দেড় মাস পরও পরিস্থিতি বদলায়নি।
সরকারি হিসাবে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৭১ হাজার একজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৫১২ জনের।
সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে প্রথম ধাপে ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরিভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকার দুই সিটিসহ চার সিটি করপোরেশনে এই কার্যক্রম শুরু হয় ১২ এপ্রিল। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে হাম ও রুবেলা (এমআর) প্রতিরোধে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়। সরকার বলছে, ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই বিশেষ কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি (১০৪ শতাংশ) টিকা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিশেষ উদ্যোগের ফলে আক্রান্তের হার কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে সরেজমিনে এশিয়া পোস্টের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
যশোরে দেড় মাসে আক্রান্ত ৪৯৮
উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ ৩০ উপজেলার একটি যশোর সদর। এখানে টিকাদানের দেড় মাস পরও গড়ে দৈনিক ১২ শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত জেলায় ৬৬১ শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত চিকিৎসা নেয় ১৬৩ শিশু, যার মধ্যে ২৫ জনের হাম শনাক্ত হয়। টিকাদান শুরুর দেড় মাস পর এখনও দৈনিক ৪ থেকে ১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
জেলার আট উপজেলাতেই প্রতিদিন নতুন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পৌরসভা ও সদর উপজেলায় এ সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। জ্বর, কাশি, গায়ে র্যাশ ও চোখ লাল হওয়ার উপসর্গ নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতাও দেখা যায়।
সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকার গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, ‘আমার সন্তান টিকা নিয়েছিল। তারপরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। কয়েক দিন ধরে জ্বর ও কাশি ছিল, পরে শরীরে দানা ওঠে। হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।’ মনিরামপুর উপজেলার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গ্রামে অনেকে এখনও হামকে সাধারণ রোগ মনে করেন। ফলে শুরুতে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিতে হয়।’
টিকা নেওয়ার পরও কেন শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে বলে জানান যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী। তিনি বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, টিকা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। আবার টিকা প্রয়োগের সময় নির্ধারিত মাত্রা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও হতে পারে।’
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘হাম অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে টিকার গুণগত মান ঠিক না থাকার কারণে টিকা নেওয়ার পর হাম হতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণা চলছে।’
মাদারীপুরে রোগী বেড়ে ৫৩৮
একই পরিস্থিতি আরেক উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ উপজেলা মাদারীপুর সদর। ৫ এপ্রিল পর্যন্ত যেখানে আক্রান্ত ছিল ৩২ জন, সেখানে টিকাদান শুরুর পরও কেবল সদরেই আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১১ জন। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় মোট রোগী দাঁড়িয়েছে ৫৩৮ জনে।
ময়মনসিংহে ৩৪ জনের মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে হামে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। ১৭ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ২২৪ জন। টিকাদান শুরুর পর ২০ এপ্রিল পর্যন্ত রোগী বেড়ে ছয় গুণ হয়েছে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারি থেকে দু-একজন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকে। তবে ১৭ মার্চ থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এজন্য হাসপাতালের আটতলায় ৬৪ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘টিকা নেওয়া, না নেওয়া দুই ধরনের শিশুই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হাম ছোঁয়াচে হওয়ায় পরিবারের অসতর্কতার কারণে এক শিশু থেকে অন্য শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে।’
নেত্রকোনা, ঝালকাঠি, গাজীপুর, ফরিদপুর, কক্সবাজারের মহেশখালী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জের চিত্রও কমবেশি একই রকম। রোগী শূন্যে না নামলেও প্রকোপ কিছুটা কমেছে বরগুনা সদর, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, নাটোর সদর, পাবনা সদর, বেড়া, ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, নওগাঁর পোরশা, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও শ্রীনগর এবং শরীয়তপুরের জাজিরায়।
টিকা নিখুঁতভাবে দেওয়া হয়নি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘টিকা দেওয়ার দেড় মাস পরও সংক্রমণের হার অনেকটা আগের মতো দেখা যাচ্ছে। এর মানে হলো, টিকা নিখুঁতভাবে দেওয়া হয়নি। বিগত সময়ে এ ধরনের বিশেষ কর্মসূচিতে যেভাবে মাইক্রোপ্ল্যান করে গোছালোভাবে প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতো, এবার সেটি হয়নি। ফলে টিকা দিলেও অনেকে এখনও বাকি রয়ে গেছে। শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতি বদলাবে।’
তিনি বলেন, ‘এবারের প্রাদুর্ভাব অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। প্রায় সব অঞ্চলে বিস্তার ঘটেছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো ক্লাস্টারে সীমাবদ্ধ না থাকায় নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত এলাকার চারপাশে বিশেষ কর্ডন করে গুরুত্ব দিয়ে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ায় সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।’
বয়সের সঙ্গে টিকার সম্পর্ক
টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়স, পুষ্টি এবং মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে বলে জানান টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি বলেন, ‘শিশুর বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম।’
এই বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা, ‘আমরা ৬ মাস থেকে টিকা দিলাম তাতে কার্যকর হবে সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ। ৯ মাস বয়সে দিলে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ আর ১৫ মাসে ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সে প্রথম ডোজ আর দ্বিতীয় ডোজ দেয় স্কুলে যাওয়ার আগে ৪ থেকে ৬ বছরের শিশুকে। কারণ, এই বয়সে দিলে টিকা কার্যকরের সম্ভাবনা ৯৭ ভাগ। অর্থাৎ, টিকার সঙ্গে বয়সের একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে।’
মায়ের অ্যান্টিবডি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মায়ের কাছ থেকে দুটি অ্যান্টিবডি আসে। একটি গর্ভে আরেকটি জন্মের পর মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে। এ কারণেই ৯ মাসের আগে সাধারণত হামের ভ্যাকসিন দেওয়া হয় না। মায়ের অ্যান্টিবডি আর পুষ্টির ঘাটতি হলে ভ্যাকসিন দিলেও খুব একটা কাজ হয় না। ফলে আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়া হচ্ছে, শকে চলে যাচ্ছে।’
অব্যবস্থাপনা
হামে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যর্থতার পেছনে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি বলেন, ‘আক্রান্তরা হাসপাতালে যাচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে না। অবস্থাপনার কারণে প্রাণহানি ঠেকানো যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, ভ্যান্টিলেটর, আইসিইউর তীব্র সংকটে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।’
