logo

‘মায়ের শরীরে এখন আমার লিভার, এতেই আমার গর্ব’

‘মায়ের শরীরে এখন আমার লিভার, এতেই আমার গর্ব’
জোসনা বেগমের সঙ্গে ছেলে সাজ্জাদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

পেটের এক পাশে ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি আর দুর্বলতা নিয়ে ফুটপাত আর হাসপাতালে ঘুরেছেন জোসনা বেগম (৪২)। চিকিৎসকরা যখন জানালেন লিভার প্রতিস্থাপন ছাড়া বাঁচানো অসম্ভব, তখন এগিয়ে এলেন তার তরুণ ছেলে মো. সাজ্জাদ। নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দিয়ে দিলেন গর্ভধারিণী মায়ের জন্য। ছেলের দেওয়া সেই লিভারে ভর করেই এখন নতুন জীবন পার করছেন জোসনা বেগম।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর জোসনার লিভার প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লান্ট) হয়। জটিল এ অস্ত্রোপচার করতে দেশের বেসরকারি ও দেশের বাইরে কোটি টাকার প্রয়োজন হলেও তা বিনামূল্যে হয়েছে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে।

মায়ের লিভার দিতে পেরে আবেগাপ্লুত ছেলে সাজ্জাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। মায়ের জন্য লিভার দিতে পেরে আমি গর্বিত।’

চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাজ্জাদ বলেন, ‘শুরুতে আমরা মুগদা মেডিকেলের গ্যাস্ট্রোলিভার বিভাগে দেখাই। এরপর অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ খেতে হয় করতে হয়। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তির অন্তত ১০ লাখ টাকা চলে যায়। তবে এখানে ভর্তির পর ওষুধ থেকে শুরু করে অপারেশন কস্টসহ (অস্ত্রোপচার খরচ) সবকিছু বিনামূল্যে হয়েছে।’

চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা পোহাতে হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক সহযোগিতা করেছে। আমাদের সিরিয়াল ১৩ নম্বরে ছিল। কিন্তু সবার চেয়ে আমাদের উপযোগী হওয়ায় আমাদেরই প্রথম ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর প্রায় মাসখানেক মাকে আর ১৫ দিন আমাকে ভর্তি থাকতে হয়েছে। প্রায় এক বছর নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হচ্ছে।‘

অন্যদিকে সাজ্জাদের মতো নিজের লিভারের একাংশ দিয়ে ছোট বোন ইশরাত আরা ইতিকে সুস্থ করে তোলা আয়েশাও এখন বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের সফলতার এক জীবন্ত উদাহরণ। তার মতোই গত এক বছরে হাসপাতালে লিভার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অলৌকিক পুনর্বাসন ঘটেছে মোট ছয়টি জীবনের। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া ইশরাত আরা ইতির শরীরে চলতি বছরের ৪ জুলাই সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে দুজনই সুস্থ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে যখন লিভার প্রতিস্থাপন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হচ্ছিল, তখন দুই বোনই মঞ্চের সামনে বসা।

লিভার-দাতা বড় বোন আয়েশা সম্প্রতি খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন। আর লিভার-গ্রহীতা ইশরাত আরা ইতি আগামী বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।

খুলনায় বেড়ে উঠলেও তাদের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায়। বছরখানেক হয়েছে ইতির অটো ইমিউন লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে সুপার স্পেশালাইজেড হাসপাতালে রেফার করেন চিকিৎসকেরা।

বোনকে লিভার দেওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে আয়েশা সিদ্দিকা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটা গর্বের বিষয়। ছোট বোনের জন্য লিভার দিয়েছি। এই জার্নিটা অনেক চ্যালেঞ্জের ছিল। অস্ত্রোপচারের পরও একটা মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে। এখন নতুন চ্যালেঞ্জ ওষুধের ব্যয় মেটানো।’

তিনি বলেন, ‘ভর্তির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়েছে। বাইরের হাসপাতালে করাতে গেলে কোটি টাকা লাগত। আমরা তো হালই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটি বিনামূল্যে করে দিয়েছে। এখন নিয়মিত মেডিসিন (ওষুধ) খেতে হচ্ছে। একেকটি ওষুধের দাম অনেক বেশি। এ জন্য সরকারি সহায়তা চাই।’

জোসনা কিংবা ইতি নয়, গত এক বছরে ছয়টি সফল লিভার প্রতিস্থান করেছে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। প্রতিটি করা হয়েছে বিনামূল্যে।

আজ এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ সময় বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী জানান, মোট তিন দফায় ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত বছরের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর এ বছরের দ্বিতীয় দফায় ৩ ও ৪ জুলাই এবং সর্বশেষ ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচারগুলো সম্পন্ন হয়।

এসব অস্ত্রোপচারে বিএমইউর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ভারতের হায়দ্রাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (এআইজি) হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিম।

অস্ত্রোপচারগুলো বাস্তবায়নে বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি, হেপাটোলজি এবং অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগসহ মোট ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগ যৌথভাবে কাজ করেছে। প্রতিবছর এই হাসপাতালে ২৪টি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপাচার্য অধ্যাপক সিদ্দিকী জানান, প্রতিটি অস্ত্রোপচারের আগে দাতা ও গ্রহীতার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং যাবতীয় আইনগত ও নৈতিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মেনে চলা হয়েছে। বর্তমানে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে রোগীদের ফলোআপ ও নিয়মিত সেবা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, রোগীদের আস্থা তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং হলেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ধারাবাহিক এই কার্যক্রম দেশে উন্নত লিভার প্রতিস্থাপন সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেন তিনি।