ফ্যাটি কিডনি কী ও কেন হয়, এই লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হোন

ফ্যাটি লিভারের কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু কিডনিতেও অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। কিডনির চারপাশে বা কিডনির টিস্যুর সঙ্গে অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টি বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে ফ্যাটি কিডনি শব্দটি সব ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তাই কিডনিতে চর্বি জমার কথা কোনো পরীক্ষা বা স্ক্যানে জানা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে এর কারণ ও কিডনির কার্যক্ষমতা ঠিক আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শে যাচাই করা জরুরি।
ফ্যাটি কিডনি বলতে কী বোঝায়?
সাধারণভাবে কিডনির ভেতরে বা আশপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমাকে ফ্যাটি কিডনি বলা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ফ্যাটি লিভারের মতো একটি একক ও সুস্পষ্ট রোগের নাম নয়। অতিরিক্ত ওজন বা বিপাকীয় সমস্যার কারণে কিডনির চারপাশে চর্বি জমতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে কিডনির টিস্যুতেও অস্বাভাবিক চর্বি জমার বিষয়টি দেখা যেতে পারে।
এ কারণে শুধু কিডনির চারপাশে চর্বি দেখা গেছে বলেই কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কিডনির কার্যক্ষমতা বুঝতে রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা, রক্তচাপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইমেজিংয়ের ফল একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
কেন কিডনিতে চর্বি জমতে পারে?
ফ্যাটি কিডনির সঙ্গে কয়েকটি বিপাকীয় ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে-
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- ইনসুলিন প্রতিরোধ
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস
- উচ্চ রক্তচাপ
- রক্তে অতিরিক্ত চর্বি
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
সাম্প্রতিক গবেষণায় কিডনির চারপাশে জমা চর্বি এবং দুর্বল বিপাকীয় স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্থূলতা, ইনসুলিন প্রতিরোধ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো সমস্যার সঙ্গে কিডনির চারপাশে চর্বি জমার প্রবণতাও বেশি দেখা যেতে পারে।
ফ্যাটি কিডনির লক্ষণ কী?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিডনির চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকলেই যে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা দেবে, এমন নয়। অনেক সময় এটি অন্য কোনো পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে।
তবে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পা ও গোড়ালিতে ফোলা
- প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন
- প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- ক্ষুধা কমে যাওয়া
- বমি বমি ভাব
- রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
এসব লক্ষণ শুধু ফ্যাটি কিডনির কারণে হয় না। কিডনির বিভিন্ন রোগেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ থাকলে পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ জানা জরুরি।
ফ্যাটি কিডনি কি কিডনির ক্ষতি করতে পারে?
কিডনির চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এক বিষয় নয়। তবে অতিরিক্ত ওজন ও বিপাকীয় সমস্যাগুলো কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিডনির ওপর চাপ পড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিডনির চারপাশের অতিরিক্ত চর্বি ও দুর্বল বিপাকীয় স্বাস্থ্যের মধ্যেও এমন সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
তাই ফ্যাটি কিডনি নিয়ে উদ্বেগের মূল বিষয় শুধু চর্বি নয়, এর সঙ্গে থাকা বিপাকীয় ঝুঁকিগুলোও।
কীভাবে বোঝা যায় কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে কি না?
কিডনির স্বাস্থ্য যাচাই করতে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করতে পারেন।
সেরাম ক্রিয়েটিনিন: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখে কিডনির ফিল্টার করার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
eGFR: কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পরিশোধন করছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব।
প্রস্রাবের পরীক্ষা: প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিন আছে কি না, তা কিডনির ক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে।
রক্তচাপ: দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির বড় ঝুঁকি।
প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্য ইমেজিং পরীক্ষাও করা হতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
ফ্যাটি কিডনি কমানোর চিকিৎসা কী?
ফ্যাটি কিডনি থেকে অতিরিক্ত চর্বি সরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো এর সঙ্গে সম্পর্কিত কারণ ও বিপাকীয় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা।
ওজন বেশি হলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাবার, রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাও প্রয়োজন।
তবে নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত নয়। কিডনির সমস্যা থাকলে কিছু ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।
খাবারের দিকে কীভাবে নজর দেবেন?
কিডনি ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো ভালো। শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও পরিমিত পরিমাণে ফলসহ সুষম খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির রোগ রয়েছে, তাদের খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই কিডনি রোগ ধরা পড়লে সাধারণ কোনো ডায়েট অনুসরণ না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নিয়মিত ব্যায়াম কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা স্থূলতা, ইনসুলিন প্রতিরোধ ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত হাঁটা বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম করা শরীরের ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
তবে কিডনির রোগ ইতিমধ্যে ধরা পড়লে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
কিডনি নিয়ে কোনো অস্বাভাবিক রিপোর্ট এলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা আগে থেকেই কিডনির সমস্যা থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
পা বা শরীর ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, দীর্ঘদিন ফেনাযুক্ত প্রস্রাব, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ফ্যাটি কিডনি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিডনির চারপাশে চর্বি জমা মানেই কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। এটি অনেক সময় স্থূলতা ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিবর্তন। তাই রিপোর্টে এমন কোনো তথ্য এলে আতঙ্কিত না হয়ে কিডনির কার্যক্ষমতা এবং ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও ওজনের মতো ঝুঁকিগুলো পরীক্ষা করা বেশি জরুরি।
স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কিডনি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: নিউজ ১৮
-44d0e7.jpg)