মামলার ডকেটের দায়িত্ব কোর্ট পুলিশের, জনবল না বাড়ালে কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা

মামলার ডকেটের দায়িত্ব কোর্ট পুলিশের, জনবল না বাড়ালে কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা
ফাইল ছবি

দেশের সব স্তরের আদালতে বিচারাধীন মামলার কেস ডকেট (সিডি) এখন থেকে সার্বক্ষণিকভাবে কোর্ট পুলিশের হেফাজতে থাকবে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ডকেট সংরক্ষণে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করতে ২০০৯ সালের নির্দেশনা সংশোধন করে এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তবে নতুন এ সিদ্ধান্তকে আইনজীবীরা স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি না করলে নতুন এ উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও পেতে পারে।

রোববার (৫ জুলাই) আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের (জিপি-পিপি শাখা) জারি করা জরুরি পরিপত্রে বলা হয়েছে, মেট্রোপলিটন ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালতসহ দেশের বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন সব মামলার কেস ডকেট এখন থেকে সার্বক্ষণিকভাবে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তার হেফাজতে সংরক্ষিত থাকবে।

সাক্ষ্য গ্রহণ বা শুনানির প্রয়োজন হলে নির্ধারিত তারিখের আগে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তা ডকেট সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে হস্তান্তর করবেন। শুনানি বা সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে তা আবার দ্রুততম সময়ে কোর্ট পুলিশের হেফাজতে ফিরিয়ে দিতে হবে।

পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ডকেট হস্তান্তর ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। এ দায়িত্ব পালনে কোর্ট পুলিশ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরকে পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা কেস ডকেট সংরক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশনার ‘গ’ ও ‘ঘ’ দফা বাতিল করে নতুন বিধান কার্যকর করা হয়েছে। পরিপত্রের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), দেশের সব জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন এ নির্দেশনা নিয়ে আইন অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আইনজীবী শাকিল আহমেদ রিপন এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিচারাধীন মামলার কেস ডকেট আদালতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি। এটি কোর্ট পুলিশের সার্বক্ষণিক হেফাজতে থাকলে নথি হারিয়ে যাওয়া বা অননুমোদিতভাবে স্থানান্তরের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে ডকেট গ্রহণ ও হস্তান্তরের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং বিচারিক কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

তবে কোর্ট পুলিশের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভাষ্য ভিন্ন। তারা বলছেন, বর্তমানে আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কারাগারের হাজতি ও আসামিদের আদালতে হাজির করা, আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পুলিশ পালন করছেন। এখন এর সঙ্গে বিচারাধীন সব মামলার ডকেট সংরক্ষণ, শুনানির আগে প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর এবং শুনানি শেষে পুনরায় গ্রহণের দায়িত্ব নতুন করে যুক্ত হয়। এতে কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

কোর্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দেশের অধিকাংশ আদালতেই প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম। প্রতিদিন শত শত মামলার শুনানি হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ডকেট গ্রহণ, হস্তান্তর ও সংরক্ষণের পৃথকভাবে রেকর্ড রাখতে হবে। এজন্য অতিরিক্ত জনবল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নতুন নির্দেশনার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা

বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলু এশিয়া পোস্টকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পিপি ও এপিপির দায়িত্ব ছিল মামলার নথিপত্র আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বুঝে নিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরে তা আবার আদালতের নির্ধারিত শাখায় মামলার আলামতসহ ডকেট বুঝিয়ে দিতে হতো। এতে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মামলার গোপনীয়তা ফাঁস ও নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে নতুন নির্দেশনায় মামলার নথিপত্র আরও নিরাপদে সংরক্ষিত থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নে একাধিক প্রশাসনিক ও বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও জনবল বৃদ্ধি ছাড়া নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

নতুন আদেশ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম চ্যালেঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার ডকেট কোর্ট পুলিশের হেফাজতে রাখতে হলে প্রায় প্রতিটি আদালতে অতিরিক্ত অন্তত একজন কোর্ট পুলিশ সদস্য নিয়োজিত করতে হবে। বিশেষ করে বড় জেলাগুলোতে বিপুলসংখ্যক আদালত থাকায় এ জনবল নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ঢাকার জেলা আদালতেই ৪২টি কোর্ট রয়েছে। সেখানে কোর্ট পুলিশের সদস্যসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, কোর্ট ইন্সপেক্টরসহ এসআইসহ কনস্টেবল নিয়ে প্রায় ১৩৫ জন দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই কনস্টেবল তাদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ কীভাবে সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের (জিপি-পিপি শাখা) জারি করা জরুরি পরিপত্রে
আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের (জিপি-পিপি শাখা) জারি করা জরুরি পরিপত্রে

তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ঢাকা জেলার কোর্ট ইন্সপেক্টর কামাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আদালতে হাজার হাজার বিচারাধীন মামলার ডকেট নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য কোর্ট পুলিশের নিজস্ব পর্যাপ্ত কক্ষ, আলমারি ও নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা বর্তমানে অনেক আদালতেই নেই। ফলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত হবার বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, আগে অনেক মামলার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ সন্ত্রাসবিরোধী, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলার নথিপত্র বাইরে চলে যেত। পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) থেকে পুলিশের হেফাজতে মামলার ডকেটে রাখা হলে নিরাপত্তা পাবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন এই দায়িত্ব পালনে প্রতিদিনের শুনানি ও সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে প্রতিটি মামলার ডকেট পুনরায় কোর্ট পুলিশের হেফাজতে ফিরিয়ে এনে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করাও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে যেসব আদালতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলার শুনানি হয়।