‘আমাকে দিয়ে হবে না’ থেকে বিসিএস ক্যাডার কুবির শামিম

সারাদিনের অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলেন। এমন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলেন ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশ হয়েছে। মুহূর্তেই বেড়ে গেল হৃৎস্পন্দন। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ওয়েবসাইটে ঢুকেও প্রথমে ফল দেখতে পারেননি; সাইট ছিল ধীরগতির। আসরের নামাজ শেষে আবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে কয়েকবার নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বর মিলিয়ে নিশ্চিত হলেন দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
বলছি— কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আজগর আলী শামিমের কথা। যিনি ৪৭তম বিসিএসের (সাধারণ শিক্ষা) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তবে এটি তার প্রথম সরকারি চাকরির সুপারিশ নয়। এর আগে ৪৪তম বিসিএসের নন-ক্যাডারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (এডি) পদেও সুপারিশ পেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি ব্যাংকে কর্মরত। এর আগে একটি স্বায়ত্তশাসিত কলেজে নবম গ্রেডের প্রভাষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে এশিয়া পোস্টকে শামিম বলেন, মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া, যার অশেষ রহমতে আমি ৪৭তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
তিনি জানান, এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত নয়। পুরো পরিবারের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তার ভাষায়, মধ্যবিত্ত পরিবারের সব ত্যাগ, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে এই একটি ফলাফল। এটি প্রমাণ করে, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের শেষটা সবসময় সুন্দর হয়।
শৈশব থেকেই নিজেকে কখনোই তথাকথিত ‘টপ ক্লাস’ মেধাবী ছাত্র মনে করতেন না শামিম। লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত এলাকার একটি সাধারণ স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই প্রথম বিসিএস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। এরপর দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
তিনি বলেন, আমি কোনো কিছু না পারলেও বারবার চেষ্টা করেছি। আজকের অর্জন দীর্ঘ লড়াই, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের ফল।
শামিমের বিসিএস যাত্রা মসৃণ ছিল না। ৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেও কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পাননি। সেই ব্যর্থতা তাকে এতটাই হতাশ করেছিল যে ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশই নেননি। পরে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে আবার প্রস্তুতি শুরু করেন। সেই প্রত্যাবর্তনের ফলই ৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ। তিনি বলেন, একসময় মনে হয়েছিল, আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু আমি লক্ষ্যের সঙ্গে কখনো আপস করিনি। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি, আবার শুরু করেছি।
একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা সবসময় তাকে মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছিল। তবে বাবা-মা, বড় ভাই এবং পরিবারের সদস্যদের সমর্থন তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তার ভাষায়, আমার পরিবার সবসময় ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই বাইরের কোনো চাপ আমাকে থামাতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিউশন ও কোচিংয়ে পড়ানোর অভিজ্ঞতা তাকে চাকরির প্রস্তুতিতে অনেক এগিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পরামর্শ, বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি এবং নিয়মিত আলোচনা তাকে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করেছে। তার মতে, সমালোচকরাও তার সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যারা সমালোচনা করত, তাদের কথাগুলোই আমাকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
জুনিয়রদের উদ্দেশে তার তিনটি পরামর্শে তিনি বলেন, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা শক্তিতে পরিণত করা। বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নেওয়া এবং ধৈর্য ধরে নিয়মিত পরিশ্রম করা। তিনি বলেন, খুব বেশি মেধাবী না হলেও ধৈর্য ও পরিশ্রম থাকলে সফল হওয়া সম্ভব। নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস রাখো, আর যত দূরই যাও, সততা ও জবাবদিহিতার মানসিকতা ধরে রেখো।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শামিম বলেন, বিসিএস ক্যাডার হওয়াকে তিনি চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেন না বরং এটি দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার একটি নতুন সুযোগ। তার ভাষায়, চাকরি করে বুঝেছি, ভালো চাকরিজীবী হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া বেশি জরুরি। দেশের প্রতি যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে চাই।
লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত এলাকার একটি সাধারণ স্কুল থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা আজ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় শামিম। তার গল্প মনে করিয়ে দেয় অসাধারণ মেধা ছাড়াও অধ্যবসায়, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং নিজের ওপর অটুট বিশ্বাসই বড় সাফল্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।





