শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে ‘মার্ক টেম্পারিং’র অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের এক শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার নম্বর পরিবর্তন (মার্ক টেম্পারিং) এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তরা হলেন—বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ এবং তার স্ত্রী ও একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিম্মা তাবাসসুম। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
বিভাগের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই শিক্ষক দম্পতি একই একাডেমিক কমিটি বা পরীক্ষা কমিটিতে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা ২০২১-২২ এবং ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের দুটি ভাইভা পরীক্ষায় অনিয়ম করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নীতিমালা ও বিভাগীয় কারিকুলাম অনুযায়ী সেমিস্টারভিত্তিক ভাইভা পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো লিখিত নির্দেশনা বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই ওই শিক্ষক দম্পতির একক সিদ্ধান্তে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন কাঠামোকে সম্পূর্ণ অননুমোদিতভাবে ৮৫ নম্বরের স্কেলে নামিয়ে আনা হয়। এতে করে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত মিম্মা তাবাসসুমের বোর্ডে পাঁচজন শিক্ষকের স্বাক্ষর থাকলেও রহস্যজনকভাবে একজনের নম্বর বাদ দিয়ে চারজনের নম্বরের গড়ে রেজাল্ট প্রস্তুত করার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ইফতেখার পারভেজের বোর্ডে পছন্দের শিক্ষার্থীদের ‘এ প্লাস’ পাইয়ে দিতে মূল মার্কশিটে নম্বর কেটে বাড়ানোর তথ্য মিলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ বলেন, অনেক সময় ভাইভার সময় আমাদের নম্বর কাটাছেঁড়া হয়, কিন্তু যেটা ফাইনাল রেজাল্ট শিট সেটাতে কোনো কাটাছেঁড়া হওয়ার সুযোগ নেই। যদি সেই ফাইনাল রেজাল্ট শিটে অন্যান্য সদস্যবৃন্দ স্বাক্ষর করার পরে এই কাটাছেঁড়া করা হতো, তাহলে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছিল। আমার যদি অসৎ কোনো উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে তো আমি আমার নিজের রেজাল্ট শিটটা একদম নতুন করে প্রিন্ট করে নিয়ে লিখে দিতে পারতাম।
আরেক অভিযুক্ত মিম্মা তাবাসসুম বলেন, অনেক স্টুডেন্ট দেখা যায় ভাইভাতে একদমই কিছু পারে না। কিন্তু আমরা তো তাকে জিরো দিতে পারি না, সে হিসেবে সর্বনিম্ন একটা মার্কস আমরা ধরে মার্কিং করি। তখন প্রথম ২২-২৩ সেশনের যে ভাইভা হয়, সেখানে এক্সটার্নাল মেম্বারসহ অন্যরা একটি ক্রাইটেরিয়া সেট করেন যে আমরা এই রেঞ্জে নম্বর দেব। সে কমিটিতে আমি মেম্বারও ছিলাম না। পরে আমার কমিটিতে এটি অনুসরণ করা হয় যাতে একটি সামঞ্জস্যতা থাকে। এক্সটার্নাল শিক্ষকের মতামত নিয়েই এটি করা হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মার্ক ডিফারেন্স যেন বেশি না হয়, সেটার জন্য একটি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ধরে মার্কিংটা করা হয়ে থাকে; এটি তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই।
তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ সময় ভাইভাতে ফাইনাল রেজাল্টের ব্ল্যাঙ্ক শিটে সিগনেচার নিয়ে নেওয়া হয়। কারণ দেখা যায় এক্সটার্নাল যিনি থাকেন উনি চলে যান, আবার আমরা যারা পরীক্ষা কমিটির মেম্বার থাকি তারাও ব্যস্ত থাকি। ফলে আগে থেকেই সিগনেচার করে দিই। আর কোনো সময় পরে সিগনেচার না দিলেও ওইভাবে আসলে যাচাই করা হয় না। কারণ একজনের রেজাল্ট বিবেচনায় না নিয়েই রেজাল্ট করা হবে, এটা তো কেউ চিন্তাও করে না।
এদিকে মার্ক টেম্পারিংয়ের পাশাপাশি মো. ইফতেখার পারভেজের বিরুদ্ধে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা সফর (ফিল্ড ট্রিপ) দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় টার্মের (ইয়ার-২, টার্ম-২) কোনো ফিল্ড ট্রিপের বিধান বিভাগের অনুমোদিত সিলেবাসে ছিল না। কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির সুযোগে ভুল সিলেবাস সংযুক্ত করে গত ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি ট্যুরের অনুমতি নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৫ মার্চ বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, সিলেবাসে না থাকায় এই ট্যুর বাবদ কোনো বিল করা যাবে না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ১০ মার্চ সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ ১৩ হাজার ৭৪৯ টাকার একটি বিল দাখিল করেন, যা ১৬ মার্চ অনুমোদন পায়।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন থেকে আমাকে আর্থিক সুবিধাসহ ছুটি মঞ্জুর করে চিঠি দিয়েছে তাই বিল সাবমিট করেছি। এখন তারা কোন প্রেক্ষিতে দিয়েছে সেটি তারা ভালো বলতে পারবে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রটোকল) মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, প্রশাসন শাখা থেকে যেভাবে চিঠি দেওয়া হয় সে অনুযায়ী আমরা ফাইল নোট করি। আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে কি না সেটি তারাই উল্লেখ করে আমাদের পাঠায়।
চিঠিতে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকা সত্ত্বেও কেন আর্থিক সুবিধাসহ চিঠি ইস্যু করা হয়েছে— এ বিষয়ে প্রশাসন শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার ড. মো. আলমগীর সরকার বলেন, এ বিষয়ে আমি বলার মতো কেউ না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসন শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ডিপার্টমেন্ট থেকে যেভাবে বলা হয় সে অনুযায়ী আমরা চিঠি ইস্যু করি।
এ বিষয়ে তৎকালীন বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মামুন মিয়া বলেন, ওই সময় ট্যুরে কারা বিল করবে সে বিষয়ে একাডেমিক কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তে উপস্থিত শিক্ষকবৃন্দ স্বাক্ষর করেছেন এবং আপনি যে শিক্ষকের কথা বলেছেন তিনিও স্বাক্ষর করেন। এটা আমাদের ইন্টার্নাল সিদ্ধান্ত ছিল। যেহেতু ওই টার্মে সিলেবাসে ফিল্ড ট্যুর ছিল না, ফলে বিল করার কোনো বৈধ অনুমতিও ছিল না।
এদিকে সার্বিক অনিয়মের তদন্তে গত ১১ মে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহিনুজ্জামানকে আহ্বায়ক এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার ড. মুহাম্মদ আলমগীর সরকারকে সদস্যসচিব করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, শীঘ্রই সভা আহ্বান করে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। পরবর্তীতে তদন্ত রিপোর্টের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, এই বিষয়টি আমি জেনেছি এবং জানার পরই কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




