অবৈধভাবে বালু তুলে ঠিকাদার বললেন ‘সব ম্যানেজ করেই চালাচ্ছি’

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে যমুনা নদীজুড়ে অবৈধ বালু উত্তোলন, চর কেটে ড্রেজিং এবং সরকারি বালু স্তূপ করে বিক্রির অভিযোগে উঠেছে প্রভাবশালী ‘চার খলিফার’ বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ ‘চার খলিফা’ নামে পরিচিত কয়েকজন বিএনপি নেতার নেতৃত্বে অন্তত ৪০টি অবৈধ বালুঘাট থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও বাল্কহেডে বালু বিক্রি হচ্ছে।
এতে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। আর হুমকির মুখে পড়েছে যমুনা সেতু ও রেলসেতুর নিরাপত্তা। উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও অদৃশ্য শক্তির বলে একদিন পার হতেই আবার চালু হয় এসব বালুমহাল।
এ বিষয়ে জানতে সিরাজগঞ্জের সাবেক কাউন্সিলর ও সিরাজগঞ্জ বালুমহালের ঠিকাদার আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, সব ম্যানেজ করে চালাচ্ছি আপনার সমস্যা কী? আপনি যা লিখার লেখেন।

স্থানীয়রা জানান, যমুনা নদীর বালু ঘিরে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বদলেছে দখলদারদের পরিচয়, বদলায়নি দখল-বাণিজ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বালুঘাটগুলো এখন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের দখলে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৪০টি অবৈধ বালুঘাট সচল রয়েছে। এসব ঘাটে ড্রেজার ও বাল্কহেড দিয়ে প্রতিদিন চলছে বালু উত্তোলন ও পরিবহন। এতে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদ লুট হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকিতে পড়েছে যমুনা সেতু ও রেলসেতুর নিরাপত্তা।
স্থানীয়রা আরও জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভূঞাপুরের নিকরাইল ও গোবিন্দাসী ইউনিয়নে অবৈধ বালুঘাট ছিল ১৯টি। এসব বালুঘাট সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার আব্দুস সাত্তার, ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদসহ প্রভাবশালী নেতারা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব বালুঘাট নিয়ন্ত্রণে নেয় সিরাজগঞ্জের বালুমহালের ঠিকাদার সাত্তার কমিশনারের সহায়তায় উপজেলায় ‘চার খলিফা’ নামে খ্যাত উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু, কোষাধ্যক্ষ সোলায়মান হোসেন লিটন, নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মন্ডল। বর্তমানে ভূঞাপুর উপজেলায় অন্তত ৪০টি অবৈধ বালুঘাট সচল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সচল সারপলশিয়া, পলশিয়া, সিরাজকান্দি, ল্যাংড়া বাজার, পাটিতাপাড়া, মাটিকাটা, চিতুলিয়া পাড়ায়।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন সচল থাকায় দেশের বৃহত্তর স্থাপনা যমুনা সেতুর পূর্ব পাড় এবং রেলসেতু এলাকা পড়েছে হুমকির মুখে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও সেতুর পূর্বপাড়ে যমুনা সেনানিবাস সীমানার উত্তর পাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে গাইড বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়াসহ হুমকির মুখে পড়েছে যমুনা সেতু ও রেল সেতু।
যমুনা সেতুর নিচ দিয়ে বাল্কহেড চলাচল অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) এর অধীনে সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআই অবকাঠামো হওয়ায় সেতু কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। কিন্তু নৌপুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব বাল্কহেড চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে পরিচালনা করেছেন না।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিকরাইল ইউনিয়নের নিকরাইল, মাটিকাটা, সিরাজকান্দী, জিগাতলা এলাকায় এবং গোবিন্দাসী ইউনিয়নে একাধিক বালুঘাট রয়েছে। যমুনা নদীতে বৈদ্যুতিক টাওয়ার স্থাপনের জন্য ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত কোটি টাকা মূল্যের এসব সরকারি বালু কয়েকটি পয়েন্টে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ বালুর পাশেই বাল্কহেডের মাধ্যমে আনলোড করা বালু স্তূপ করে সরকারি বালু লুটের মহোৎসব চলছে। এছাড়া ড্রেজারের মাধ্যমেও যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। বালু উত্তোলনের পাশেই একাধিক বাল্কহেড দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, যমুনা তীরে এসব বালু নিয়ন্ত্রণ করেন ভূঞাপুরের ‘চার খলিফা’ হিসেবে পরিচিত বিএনপি নেতারা। এছাড়া উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ফরহাদুল ইসলাম শাপলা, নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মণ্ডলের ছোট ভাই বিএনপি নেতা আলম মন্ডল, ইউনিয়ন তাঁতি দলের সাধারণ সম্পাদক মো. হাসমত প্রামাণিক, উপজেলা বিএনপির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সরকার শরীফ, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাজিব হোসেন তালুকদার কফিল, মোহসিন তালুকদার দিপু, মো. আসলাম মেম্বার এবং সিরাজগঞ্জ বালুমহালের ঠিকাদার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সাত্তারের তত্ত্বাবধানে প্রতিদিন শত শত ট্রাকযোগে বালু লুট করে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হলেও অদৃশ্য প্রভাবশালী মহলের কারণে একদিন পরই আবার চালু হয়ে যায় অবৈধ বালুঘাট। ফলে যমুনার বুকে চলছে সরকারি সম্পদ লুটের এক অবিরাম মহোৎসব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক বলেন, দিন-রাত ড্রেজার আর বাল্কহেড চলে। নদীর পাড় ভেঙে আমাদের আবাদি জমি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু অভিযান শেষ হলেই আবার আগের মতো বালু তোলা শুরু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, এখানে প্রকাশ্যেই শত শত ট্রাকে বালু বিক্রি হয়। সবাই জানে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। যদি কেউ মুখ খুলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এদিকে সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, যমুনা সেতু ও রেলসেতুর এত কাছে যেভাবে ড্রেজিং হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা আতঙ্কিত। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই অবৈধ বালুঘাট বন্ধ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত প্রশাসনের।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক আসিফ হোসেন জানান, কয়েকবার প্রতিবাদ করেছি কিন্তু প্রভাবশালী বিএনপি নেতা সেলিমুজ্জামান সেলু ও সাত্তার কমিশনার ভয়ে আমরা কিছুই করতে পারছি না। এদিকে প্রশাসনও নীরব ভূমিকা পালন করছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বলেন, আমার কোনো বালুর ঘাট নেই। তবে আমি সিরাজগঞ্জের সাত্তারের সঙ্গে বালুর ব্যবসা করি।
এ ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ফরহাদুল ইসলাম শাপলা বলেন, বালুমহলের সঙ্গে আমি জড়িত নই। তবে বিএনপির অন্য চার নেতা বালুমহালের সঙ্গে জড়িত। আমি রাজনীতি করি, অন্য কোনো পেশায় জড়িত নই।
এ প্রসঙ্গে নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি এ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। কে বা কারা মালিক তা বলতে পারবো না।
এ ব্যাপারে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, তারা কোথায় বালু ফেলছেন এবং কাগজপত্র আছে কি না তা যাচাই করে বলা যাবে। গোবিন্দাসী এবং নিকরাইলে প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর বৈধতা রয়েছে কি না তা স্ট্যাডি ছাড়া বলা খুবই কঠিন। এর আগে অভিযান করা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

ভূঞাপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির এসআই আব্দুল কালাম আজাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাল্ক হেডের বৈধতা আছে কি না, তা কাগজপত্র নিয়ে দেখতে হবে। তবে নিয়ম মোতাবেক তাদের একাধিকবার নিষেধ করা হয়েছে।
নিষেধ করার পরও কেন চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার আরও অফিসার রয়েছে, তার সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমরা উপজেলা প্রশাসনকে বলেছি দ্রুত যেন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
সিরাজগঞ্জের আব্দুস ছাত্তারের টাঙ্গাইলের বালু উত্তোলন কিংবা ফেলার কোনো বৈধতা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের এ পাশে বালু উত্তোলনের কোনো প্রকার লাইসেন্স কিংবা অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। প্রতিনিয়তই আমাদের অভিযান চলছে। আমাদের অভিযানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেব।





