logo

ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারাল জন্মের তিন দিনে মাকে হারানো আরফা

ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারাল জন্মের তিন দিনে মাকে হারানো আরফা
কবরের পাশে ও বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: কোলাজ

জন্মের তিন দিনের মাথায় মাকে হারায় আরিফিন ইসলাম আরফা। এবার ডেঙ্গুতে বাবাকেও (৪০) হারিয়েছে শিশুটি।

আরফার বাবা মো. তাজুল ইসলাম রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আরফার জন্মের পর আট বছর একাই শিশুটির বাবা ও মায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন তাজুল। মেয়ের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধেননি।

বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

তাজুল ও তার স্ত্রী দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। দীর্ঘদিনের পরিচয় থেকে দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০১৪ সালে তাদের বিয়ে হয়। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর হাসপাতালে জন্ম নেয় আরফা। বাবার মৃত্যুর পর শিশুটি এখন তার দাদির কাছে রয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্মের পর হাসপাতালে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র খিঁচুনি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন তাজুলের স্ত্রী। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। পেটের সেলাই ফেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে যশোর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তার।

স্ত্রীর মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তাজুল। তিন দিনের শিশুকন্যাকে নড়াইল থেকে ঢাকায় এনে নিজের মায়ের কাছে তুলে দেন। স্ত্রীর শোক আর সন্তানের চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ছয় মাসের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ সময় মেয়ে আরফার চিন্তা তাকে মানসিক শক্তি জোগায়।

আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

পেশাগত জীবনে তাজুল পারিবারিক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও টিসিবির ডিলারশিপের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এই আয়ে সংসার ও মেয়ের খরচ চলত। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

আরফা রামপুরার একরামুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। মা মারা যাওয়ার পর বাবা ও দাদি মিলে তাকে বড় করেছেন।

আরফার ভাষায়, ‘মা চলে যাওয়ার পর বাবাই ছিল আমার মা-বাবা, সঙ্গে ছিল দাদি। দাদি ও বাবা একসঙ্গে স্কুলে নিয়ে যেত। বাবার সঙ্গে রাগ বা অভিমান করলে খেলনা এনে দিত। প্রতিদিন ৫০ টাকা দিত নাশতা খেতে। যেহেতু আমার বিড়াল পছন্দ, তো তার জন্য পছন্দের খাবার আনত। যে মানুষটা আমার পৃথিবী ছিল সে মানুষটা আর আসবে না, কথা বলবে না, হাঁটবে না।’

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

বাবার স্মৃতিচারণ করে আরফা বলেন, ‘আমি অনেক সময় ঘুমালেও বাবা বাসায় এসেই ঘুমিয়েছি কি না, দাদির কাছে জিজ্ঞেস করত। এক পলক না দেখে বাবা থাকতে পারত না।’

রামপুরার ওয়াপদা সড়কের ১৪৭ নম্বর বাসায় যৌথ পরিবারে বসবাস ছিল তাজুলের। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাসাজুড়ে সুনসান নীরবতা। সন্তান হারানোর শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাজুলের মা-বাবা, মেয়ে ও পরিবারের অন্য সদস্যরা।

এ সময় কথা হয় তাজুলের বড় ভাই মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে মা-বাবা, আমি এমনকি ছোট্ট আরফাও জ্বরে আক্রান্ত হই। সবাই সুস্থ হলে তাজুলের জ্বর শুরু হয়। কয়েকদিন বেশ ভালো ছিল, খাচ্ছিলও ঠিকঠাক। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামপুরার বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপরের ৭২ ঘণ্টায় সবকিছু এলামেলো হয়ে যায়।’

তাজুলের জ্বরের সময় বাবার পাশে থাকত আরফা। সে জানায়, বাবা তাকে বলেছিল, ‘আমার কলিজাটা মনে হয় বের হয়ে যাচ্ছিল।’ কিন্তু দাদিকে জানাতে নিষেধ করেছিল।

বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

জ্বর হলে রাতে বাবার মাথায় পানি ও জলপট্টি দেয় আরফা। জানায়, ‘বাবার অনেক কষ্ট হতো। বেশি জ্বর হলেও বাবা কাউকে সহজে বুঝতে দিতেন না। পরিবারের সবাই জানতেন বাবার ডেঙ্গু হয়েছে, কিন্তু কেউ তা বলেনি।’

হাসপাতালে ভর্তির দিনের কথা বলতে গিয়ে আরফা জানায়, কান্না থামাতে বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি বাসায় যাও, আমি কালই চলে আসব।’

শফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে তাজুলের রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। তার হাত কাঁপছিল এবং প্রচুর বমি হচ্ছিল। খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে শফিকুল ইসলাম জানান, তাজুল ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভাইরাসের প্রভাবে তার নিউমোনিয়া হয়। এরপর একে একে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে (মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউর)। একপর্যায়ে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।

আরফা বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হলে আমি সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা বলেছিল, তেমন সমস্যা নেই, আমি কালই চলে আসব। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি যাতে কান্না না করি সে জন্য বাবা এমনটা বলেছিল। পরদিন যখন হাসপাতালে যাই, তখন দেখি বাবার খিঁচুনি উঠেছে, অক্সিজেন লাইন লাগানো। বাবার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করেছি, তবুও বাবাকে আল্লাহ নিয়ে গেছেন।’