নিবন্ধন ছাড়াই চলছে এক লাখ ফার্মেসি, প্রতি মাসে বাড়ছে আরও ২৩৭টি

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯০ হাজার ফার্মেসি যথেষ্ট।
  • দেশে শুধু নিবন্ধিত ওষুধের দোকান ২ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি।
  • নিবন্ধিত ফার্মেসিগুলোর মাত্র ৭ শতাংশ ‘মডেল ফার্মেসি’।
  • প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ওষুধ।
  • বেশি বেতনের ভয়ে এ ক্যাটাগরির গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়াই চালানো হচ্ছে ফার্মেসি।
নিবন্ধন ছাড়াই চলছে এক লাখ ফার্মেসি, প্রতি মাসে বাড়ছে আরও ২৩৭টি
এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ছবি।

নিবন্ধন ছাড়াই চলছে দেশের প্রায় এক লাখ ওষুধের দোকান। আর নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা সোয়া দুই লাখ ছাড়িয়েছে। এই সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও প্রতি মাসে নতুন করে অনুমোদন পাচ্ছে আরও ২৩৭টি। বিদ্যমান ফার্মেসিগুলোর ৯৩ শতাংশেই নেই সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা মডেল কাঠামো। ফলে ঝুঁকিতে পড়ছে ওষুধের গুণগত মান।

ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে পাঁচ থেকে ১০টি ওষুধের দোকান থাকা উচিত। এই হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ ৯০ হাজার ফার্মেসি যথেষ্ট। কিন্তু দেশে কেবল নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই দুই লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি। এর বাইরে অনুমোদনহীনভাবে চলছে আরও প্রায় এক লাখ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র। এগুলোর মাত্র সাত শতাংশ কিছুটা নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত ফার্মেসি দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে। ঘর থেকে পা ফেললেই মুদি দোকানের মতো অবস্থা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তো বটেই, আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও এত কম দূরত্বে ওষুধের দোকান নেই। সরকার জনবসতি বিবেচনায় নিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে পারেনি।’

লাইসেন্স দেওয়ার হিড়িক

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) তথ্যমতে, চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ওষুধের দোকান থাকার পরও মাসে গড়ে ২৩৭টি নতুন বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ডিজিডিএর নিয়ম অনুযায়ী, একটি মডেল ফার্মেসির জন্য ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট এবং মডেল মেডিসিন শপের জন্য ১২০ বর্গফুট পাকা স্পেস, এসি এবং ইনসুলিন বা ভ্যাকসিন রাখার জন্য সচল ফ্রিজ থাকা বাধ্যতামূলক।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৪ হাজার ২৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মডেল ফার্মেসি মাত্র ৭৯টি, যা মোট অনুমোদনের মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এর বাইরে অনিবন্ধিত ফার্মেসি আছে প্রায় এক লাখ। সেগুলোকেও নিবন্ধনের আওতায় আনতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিজিডিএ।

গরমে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের কার্যকারিতা

উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখতে মডেল ফার্মেসি জরুরি। কিন্তু ডিজিডিএর তথ্যমতে, দেশের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৭ শতাংশ মডেল ফার্মেসি বা মডেল মেডিসিন শপ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থাৎ, বাকি ৯৩ শতাংশ ফার্মেসি এখনও এই আধুনিক মডেল কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে, যার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) এবং সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, ওয়্যারহাউস এবং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে ওষুধজাতীয় পণ্যের গুণগত মান ও কার্যকারিতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে ওষুধের সুরক্ষায় পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ, তথা তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলোর তীব্রতা কঠোরভাবে দেখভাল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর নিয়ম অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা (জলবায়ুভেদে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং ৬০ শতাংশের নিচে আপেক্ষিক আর্দ্রতা (রিলেটিভ হিউমিডিটি) থাকা আবশ্যক। এ ছাড়া বিশেষ কিছু জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ডিপ ফ্রিজ বা কোল্ড চেইনের নিয়ম মেনে সার্বক্ষণিকভাবে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সংবেদনশীল ওষুধে তাপমাত্রার হেরফের হলে তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে রোগীর উল্টো ক্ষতি হতে পারে। ফলে এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

রাজধানীর শাহবাগ, আজিজ কো-অপারেটিভ মেডিসিন মার্কেট কিংবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীতের মার্কেটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শত শত ওষুধের দোকানের সিংহভাগেই কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র নেই।

শাহবাগের বিপণিবিতানের নিচতলার মার্কেটে ৪০টির মতো ওষুধ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর দু-একটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র দেখা গেলেও বেশিরভাগেই নেই। মার্কেটটিতে পাইকারি ও খুচরা ওষুধ বিক্রি করছে পপুলার মেডিকেল স্টোর। কিন্তু নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

ফার্মেসির মালিক যোগেস চন্দ্র কর্মকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, বলেন, ‘ওষুধের মান নষ্ট হতে পারে, এটা জানি। কিন্তু অধিদপ্তর থেকে কখনও এ ব্যাপারে বলা হয়নি।’

আজিজ মার্কেটের সানিম ফার্মার মালিক মোহাম্মদ ফোরকন উদ্দিন জানান, সেন্ট্রাল এসি লাগানোর কথা বলে মার্কেট কর্তৃপক্ষ টাকা নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি।

একই চিত্র দেখা যায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে অবস্থিত মসজিদ মার্কেটে। সেখানে ১৮টি ওষুধ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

মার্কেটের মুন মুন ফার্মার ব্যবস্থাপক (বিপণন) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পশ্চিমমুখী হওয়ায় সূর্যের আলো এখানে সরাসরি এসে পড়ে। কিন্তু ব্যবস্থা না থাকায় ওষুধের মান নষ্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে ড্রাগিস্ট কিংবা মালিক সমিতি ব্যবস্থা নিতে পারে। তারা না করলে অধিদপ্তর কঠোর হোক।’

প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ক্যানসারের ওষুধ

ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্যানসারের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ওষুধের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আরও কঠোরভাবে প্রযোজ্য। তবে মাঠপর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই।

জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পাশে সামারা ড্রাগস থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই স্তন ক্যানসারের ওষুধ কিনতে দেখা যায় ফারুক আহমেদ নামের এক রোগীকে। তিনি বলেন, ‘মোবাইলে লিখে এনেছি। চাওয়া মাত্রই দিয়েছে, প্রেসক্রিপশন চায়নি।’

ডিজিডিএর পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনেন। এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হলেও সামাজিক অবস্থার কারণে শতভাগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’

লাইসেন্স নবায়নে অনীহা

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর ড্রাগ লাইসেন্স নবায়নের বিধান থাকলেও অনেক দোকানদারই তা পালন করছেন না। রাজধানীর মিটফোর্ডকে বলা হয় পাইকারি ওষুধ বিক্রয়কেন্দ্রের রাজধানী।

এই এলাকার ডিসি রায় সড়কের চয়নিকা মেডিসিন কর্নারের নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১ জুলাই। নতুন করে নবায়নের আবেদন করা হয়েছে বলে দাবি করেন কর্মকর্তা সজিব বর্মন। তবে এ সংক্রান্ত কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি।

রাজধানীজুড়েই বিভিন্ন অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নিবন্ধনহীন ফার্মেসি। রামপুরার পূর্ব উলন সড়কের শিউলি ফার্মেসি তিন বছর ধরে কোনো নিবন্ধন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই এলাকার ১০টি ফার্মেসি ঘুরে মাত্র তিনটির নিবন্ধন পাওয়া গেছে।

ডিজিডিএর পরিচালক ও মুখপাত্র ড. মো. আকতার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিবন্ধনের বাইরে প্রায় এক লাখ ফার্মেসি থাকতে পারে। অভিযান চালানো হচ্ছে, তবে বড় আকারে অভিযান চালালে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই সংশোধন হওয়ার সময় দেওয়া হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক পরিচালক বলেন, ‘মূলত বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ দোকান টিকে আছে। খুচরা বিক্রির অনুমোদন নিয়ে অনেকে পাইকারি ব্যবসা করছে। এসব অনিবন্ধিত দোকানের মাধ্যমেই বাজারে নকল ও ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে।’

গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এড়াচ্ছেন মালিকরা

ডিজিডিএর পরিচালক আকতার হোসেন তদারকির ব্যর্থতা ও সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন। কিন্তু বেশি বেতনের ভয়ে অধিকাংশ ফার্মেসি মালিক তাদের নিয়োগ দিতে চান না। এ ছাড়া জনবল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে সবসময় তদারকি করাও কঠিন।’

মাত্র ৭ শতাংশ মডেল ফার্মেসি থাকার বিষয়ে আকতার হোসেন বলেন, ‘মডেল ফার্মেসি নিয়ে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। বিক্রয়কেন্দ্রগুলো আমাদের শর্ত দেখছে না, ভাড়ার দিক চিন্তা করে একেবারে ছোট্ট ঘরে করা হচ্ছে। অথচ শর্ত অনুযায়ী, মডেল ফার্মেসির জন্য ৩০০ ফুট জায়গা লাগবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়াও এ ক্যাটাগরির গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ওষুধ খাতের বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলো এগিয়ে আসলে দ্রুত মডেল ফার্মেসির পরিধি বাড়বে। যেসব সক্ষম ওষুধ ব্যবসায়ী রয়েছে, তারা ওষুধের গুণগত মান সংরক্ষণে মডেল ফার্মেসিতে গুরুত্ব দিলে অন্যরাও আগ্রহী হবে। মানুষ ভেজালমুক্ত ও মানসম্মত ওষুধ পাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার বলেন, ‘ফার্মেসির মালিকরা মনে করেন অষ্টম-দশম শ্রেণিতে পড়ুয়াদের দিয়ে যখন কাজ হচ্ছে, তখন বেশি বেতন দিয়ে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট কেন নিয়োগ দেবে? এখানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও মালিক; উভয়পক্ষেরই আন্তরিকতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।’