পল্লবীর অপরাধজগতে নতুন আতঙ্ক ‘ল্যাংড়া রুবেল’

রাজধানীর পল্লবী-মিরপুরের অপরাধজগতে আবারও আলোচনায় এসেছেন মো. রুবেল ওরফে ‘ল্যাংড়া রুবেল’। অটোরিকশাচালক রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১ নম্বর আসামি ছিলেন এই রুবেল। সানি হত্যার ঘটনার পর এবার প্রকাশ্যে চা-স্টলে বসা মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করার মামলায়ও নাম এসেছে তার।
শুধু তা-ই নয়, মামলার এজাহারে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথা, পেট ও পিঠ লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে মো. রুবেলের বিরুদ্ধে। একটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আহত হয়েছেন ৬৩ বছর বয়সী এক পথচারী নারী।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকেল পৌনে ৬টার দিকে পল্লবী থানাধীন সেকশন-১১, ব্লক-বি, রোড-২-এর ২৬ নম্বর বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ইমনের চা-স্টলের সামনে রুবেল গুলির ঘটনা ঘটিয়েছে উল্লেখ করে পল্লবী থানায় মামলা করা হয়েছে।
গুলিতে আহত মাছ ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনের স্ত্রী রিনা আক্তার বাদী হয়ে শনিবার (৮ আগস্ট) এ মামলা করেন। মামলায় রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল (৩৭) এবং পাপ্পু ওরফে শাকিল আহমেদ ওরফে শাকির আহমেদ ওরফে পাপ্পুকে (৪১) নামীয় আসামি করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, পূর্বশত্রুতার জের ধরে একটি প্রাইভেট কারে করে রুবেল, পাপ্পুসহ কয়েকজন সেখানে আসে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুবেল পিস্তল দিয়ে আলমগীরের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করেন।
এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিটি আলমগীরের মাথার ডান পাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। গুলির আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাকে লক্ষ্য করে পেটে ও পিঠে আরও দুই রাউন্ড গুলি করা হয় বলে অভিযোগ। এরপর পাপ্পুসহ অন্যরা গুলি চালাতে থাকে। এ সময় একটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পথচারী জোসনার (৬৩) পায়ে লাগে। হামলাকারীরা আশপাশের লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে প্রাইভেট কারে করে পালিয়ে যায় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ আলমগীরকে স্থানীয়দের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এজাহারে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত জোসনাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, রাত ১২টা ৫ মিনিটে বাদীর কম্পিউটার টাইপ করা এজাহার থানায় পৌঁছানোর পর মামলাটি করা হয়। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলামকে।
এই গুলির ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে রুবেলের বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো গুরুতর অভিযোগগুলোও। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অটোরিকশাচালক রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালের জুনে পল্লবীর মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতের মা রোজিনা বেগম বাদী হয়ে ১০ জুন পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় এম এম রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। বোমা কাল্লু, স্বপন, জিন্দা ও টান নামে আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
ওই মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছিল, আড্ডা দেওয়ার কথা বলে সানিকে ডেকে নেওয়ার পর তার দুই হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে আটকানো হয়। পরে মুখ ও শরীর গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থায় তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
‘পেপার সানি’ হত্যার মামলায় প্রধান আসামি হওয়ার পরও রুবেলের নাম ফের একটি প্রকাশ্য গুলির ঘটনায় আসায় পল্লবী-মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলম মোল্লার অভিযোগ, মিরপুর-১১, কালশী, মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। তাদের মধ্যে রুবেল ও তার সহযোগীদের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এক বছর আগে রুবেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। পুলিশ তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে শুক্রবার আলমগীরকে গুলি করতে পারত না।
এ বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান বাসির বলেছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে রুবেলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে। মাদক ব্যবসা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করেন ওসি।
শুক্রবার গুলির ঘটনার পরপরই পল্লবী থানার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। ডিবির এক কর্মকর্তা শনিবার সন্ধ্যায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, এলাকার আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায়ী দ্বন্দ্বের জের ধরে গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আরও কিছু বিষয় ও প্রশ্ন সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
প্রশ্নগুলো কী, জানতে চাইলে ডিবি কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘তদন্তের সামনে একাধিক প্রশ্ন আছে। প্রথমমত চা-স্টলের মতো জনবহুল স্থানে কীভাবে অস্ত্রধারীরা এসে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালিয়ে গেল? ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি কার? অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এলো? হামলার প্রকৃত কারণ কী? এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ কী? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘পেপার সানি’ হত্যার মতো গুরুতর মামলায় নাম আসার পরও যদি একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আবার প্রকাশ্য অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে এত দিন তিনি কীভাবে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন?
তিনি আরও বলেন, এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেলে রুবেলের আধিপত্য ও এমন প্রকাশ্যে গুলির রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি এলাকার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক অনেক কিছুই জানা যাবে বলে মনে করছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অর্থনৈতিক ভিত্তি খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে রুবেলসহ যাদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা, জামিন, গ্রেপ্তার ও তদন্তের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা জরুরি।




