তাহসিফকে আগেও হত্যার চেষ্টা করা হয়, দাবি পরিবারের

রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় দেশজুড়ে যখন তোলপাড়, তখন তার পরিবার জানাল আরও এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
নিহত তাহসিফের পরিবারের দাবি, রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকায় মোটরসাইকেল চাপা দিয়ে তাহসিফ সৌরিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও দীর্ঘদিন আহত অবস্থায় ছিলেন। তবে প্রথম দফায় ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় দফায় নিখোঁজের পরদিন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে তুরাগের উত্তরা রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনে এশিয়া পোস্টের কাছে এমন অভিযোগ করেন স্বজনরা।
এর আগে উত্তরখানের রাজাবাড়ি ঘাঁট-সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে বিমানবাহিনীর অব. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
নিহত তাহসিফ সৌরি তুরাগের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনের কে এম এনায়েতুল করীম হেলালের বড় ছেলে। তারা তিন ভাই বোন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তাহসিফ সৌরি ছিলেন সবার বড়।
নিহত সৌরির বাবা কে এম এনায়েতুল করীম হেলাল এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাসায় থেকে দিপ নামের এক বন্ধু বাসা থেকে ডেকে বের করে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাহসিফ সৌরি নিখোঁজ ছিল। পরে আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাইনি। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার আগে উত্তরখান থানা থেকে আমাকে জানানো হয়, তার মরদেহ পাওয়া গেছে।'
এক প্রশ্নের জবাবে এনায়েতুল করীম এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। লাশ নদীতে পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় ও (সৌরি) কখনোই যায় না। আমরা চাই এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সেই সঙ্গে হত্যাকারীদের বিচার হোক।'
তিনি আরও বলেন, '২০২৪ সালে বিমানবাহিনীর বিভাগীয় সিদ্ধান্তের কারণে সৌরি অবসর নেয়। পরবর্তীতে ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ এবং একটি গ্রুপের সঙ্গে প্রাইভেট জব করেছিল। পরে মাস দেড় আগে মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করে রেস্টে বাসায় ছিল।'
সৌরির বাবা বলেন, 'সৌরি অত্যন্ত সৎ, ভদ্র ও একজন সামাজিক ও বিনয়ী ব্যক্তি ছিল। সবড় প্রিয় পাত্র ছিল।'
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহত সৌরির এক চাচা এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। গত এক মাস আগেও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় গাড়িচাপা দিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে গেলেও আহত হয়ে দীর্ঘদিন বাসায় বিশ্রামে ছিল। দ্বিতীয় দফায় তাকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ তুরাগ নদে ফেলে দেয়।'

তিনি আরও বলেন, 'সাধারণত সৌরির কোনো শত্রু ছিল না। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো বড় ধরনের একটি চক্র জড়িত। কিন্তু তারা কারা, সেটি জানা নেই।'
তাহসিফের ছোট চাচা তাহসিনুল করীম সাউদি এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সৌরির মোবাইল থেকে তার মাকে বয়েস মেসেজ দিয়ে বলেছে, ও বাসায় আসতেছে। তার পর থেকেই তার মোবাইল বন্ধ ছিল। তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। দীপ নামের এক বন্ধু এসে তাকে বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিল। দীপ সৌরির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার আরেক চাচা এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'গভীর রাতে যে বয়েস মেসেজটি সৌরির মোবাইল থেকে এসেছিল, সেটি তার না। আমরা বয়েস রেকর্ডিংটি যাচাই করে দেখেছি, সেটি সৌরির ছিল না। তার ধারণা করছি, সৌরিকে আগেই হত্যা করা হয়েছে। পরে তাকে যেন খোঁজাখুজি করা না হয়, তার জন্যই ওই বয়েস মেসেজটি পাঠানো হয়েছিল।'
এর আগে গাজীপুরের টঙ্গীর নৌ-পুলিশ জানিয়েছে, ভাসমান অবস্থায় তুরাগ নদ থেকে একটি অজ্ঞাতনামা ২৭ থেকে ২৮ বছর বয়সী যুবকের ভাসমান মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহের পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা ছিল। তার হাতে একটি ঘড়ি ছিল। সঙ্গে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই মোবাইলের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তাহসিফের চাচার দাবি, সৌরি বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল ছিল। মোটরসাইকেলেই করেই তিনি বাসা থেকে বের হোন। সেই সঙ্গে তার পকেটে একটি মানিব্যাগ ছিল। হত্যাকারীরা হাত ঘড়ি ও মোবাইল ফোন না দিলেও মানিব্যাগ ও মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে।'
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'মোবাইল ফোন নিয়ে গেলে, ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণেই হত্যার পর মোবাইল ফোনটি খুনিরা নেয়নি।'
তুরাগ নদের ঘাঁটে কথা হয় তাহসিফের মরদেহ নদে ভাসতে দেখা নৌকার মাঝি মোহাম্মদ রাজিবের সঙ্গে। তিনিই প্রথম মরদেহ দেখতে পান। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দুপুর ২টা পর্যন্ত ডিউটি ছিল। ডিউটি শেষ করে টঙ্গী নদীবন্দর থেকে নৌকা দিয়ে রাজাবাড়ি ঘাটে আসার পথে নদীতে একটি মানুষের একটি লাশ ভাসতে দেখতে পাই। তারপর ঘাট ইজারাদারকে ফোন দিয়ে জানাই। তারপর ইজারাদার এসে লাশটি উদ্ধার করে তুরাগ নদীর রাজাবাড়ি ঘাটে নিয়ে যান।’
এ বিষয়ে কথা হয় টঙ্গী নদীবন্দরের ইজারাদার মোহাম্মদ রাব্বির সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহের পাজামার পকেট থেকে একটি আইফোন পাওয়া যায়। মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল। পরে চার্জে লাগিয়ে চালু করা হলে সঙ্গে সঙ্গে মেজর জহির নামের একজনের ফোন আসে। তিনি নিহতের খালাতো ভাই পরিচয় দেন। তারপর লাশটি রাজাবাড়ি ঘাটে আছে বলে তাকে জানাই। পরে তিনি ও পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়।’
নৌ পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিদেন থেকে জানা যায়, সৌরির মরদেহ উদ্ধারকালে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। হাত দুটি মাথার সামনে বাঁকা ছিল। শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি। পেট ফোলা ছিল।
স্বজনদের দাবি, বিমানের সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরিকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। অথবা এমনভাবে হত্যা করা হয়েছে, যেন কোনো আঘাতের চিহ্ন না পাওয়া যায়।
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, টঙ্গী নৌ পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করেছে, আমরা তাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি মরদেহটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির।











