logo
Advertisement

সারের অভাবে শঙ্কায় ঝিনাইদহের কৃষকেরা

হাবিব ওসমান,ঝিনাইদহ
সারের অভাবে শঙ্কায় ঝিনাইদহের কৃষকেরা
জমিতে সার ছিটাচ্ছেন কৃষকেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ধানের চারা সবুজ হয়েছে, মাঠজুড়ে এখন নতুন ফসলের স্বপ্ন। কৃষকের চোখে ভালো ফলনের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই স্বপ্নের ফসল বাঁচাতে এখন বড় দুশ্চিন্তার নাম সার।

Advertisement

ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাহিদামতো সার মিলছে না। দিনের পর দিন দোকানে দোকানে ঘুরেও অনেক কৃষক ফিরছেন খালি হাতে। কোথাও বলা হচ্ছে সার নেই, আবার কোথাও বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলেই কাঙ্ক্ষিত সার পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।

অন্যদিকে কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সার বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে প্রয়োজনের সময় সার কেন পৌঁছাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে কৃষকের হাহাকার, অন্যদিকে কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত মজুতের দাবি—দুইয়ের মাঝে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক টিপু সুলতান চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছেন। জমিতে এখন ধানের চারা বেড়ে উঠছে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

টিপু সুলতান বলেন, জমিতে সময়মতো সার দিতে না পারলে ধানের ফলন কমে যাবে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক দোকানে ঘুরেও সার মিলছে না। বাড়তি টাকা দিলে কোথাও কোথাও সার পাওয়া যায় বলে শুনছি। এভাবে চললে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হবে, পাশাপাশি বাড়বে উৎপাদন খরচ।

টিপু সুলতানের মতো একই অভিযোগ জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের। ধানের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে সকাল থেকে দোকানে দোকানে ঘুরছেন তারা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে চাহিদার তুলনায় কম সার পাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ সার না পেয়েই খালি হাতে ফিরছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারনির্ধারিত দামে সার বিক্রির কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। নির্ধারিত দামে সার চাইলে সংকটের কথা বলা হচ্ছে; অথচ বাড়তি দাম দিতে রাজি হলে কোথাও কোথাও সেই সারই পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি দামে যদি সার না থাকে, তাহলে বাড়তি দামে কীভাবে একই সার পাওয়া যাচ্ছে?

শৈলকুপার কৃষক উজ্জ্বল মিয়া বলেন, জমিতে সার লাগবে এখনই। কয়েকদিন পর দিলে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। কিন্তু দোকানে গেলে বলে সার নেই। অথচ বেশি দাম দিতে চাইলে সার পাওয়া যায়। আমরা কৃষক, বাড়তি দাম দিয়ে সার কেনার সামর্থ্য সবার নেই।

আরেক কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, ধানের আবাদে সার না দিলে ফলন হবে না। সার যদি গুদামে থাকে, তাহলে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন—সেটাই আমাদের প্রশ্ন। সরকারি দামে প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার নিশ্চয়তা চাই।

কৃষকেরা বলছেন, ধানের আবাদে প্রতিটি ধাপের সঙ্গে সময়ের হিসাব জড়িত। জমিতে যখন যে সার প্রয়োজন, তখনই তা প্রয়োগ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে সার প্রয়োগ করা না গেলে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সার দিয়েও সবসময় সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয় না। এতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাদের অভিযোগ, সারের সংকট কিংবা বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হলে সরাসরি বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়ও।

কৃষকদের ভাষ্য, কাগজে-কলমে গুদামে সার থাকলেই হবে না, সেই সার সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। কারণ সারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো মৌসুমের ফসল, কৃষকের বিনিয়োগ ও পরিবারের জীবিকার হিসাব।

কৃষকেরা সারের বরাদ্দ থেকে শুরু করে ডিলার, খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কোথাও সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে, নাকি মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে—তা তদন্তেরও দাবি জানান তারা।

অন্যদিকে কৃষি বিভাগের হিসাবে জেলার চিত্র ভিন্ন। তাদের দাবি, কৃষকের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। ফলে জেলায় সার সংকটের কোনো কারণ নেই।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। কোথাও যদি নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া বা সার না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো কৃষক সার না পাওয়া বা বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ কৃষি বিভাগকে জানালে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :