
পাঁচ বছর বয়সে চোখের আলো হারিয়েছেন চিত্তরঞ্জন মহলদার। এরপর পেরিয়ে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়। পৃথিবীর রূপ-রং, চাঁদের আলো কিংবা নিজের স্ত্রী-সন্তানের মুখ কোনো কিছুই দেখা হয়নি তার। তবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর থেমে থাকেনি জীবন। গরুর জন্য ঘাস কাটা, গোয়াল পরিষ্কার, হাঁস-মুরগি লালন-পালন, মাছ ধরা, রান্না করা ও কাঠ কাটাসহ নিজের প্রয়োজনের প্রায় সব কাজই করেন নিজ হাতে। অন্যের ওপর নির্ভর না করে জন্মভিটায় স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকাই তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
চিত্তরঞ্জনের বাড়ি খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার ৪ নম্বর সুরখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভগবতীপুর গ্রামে। উপজেলা সীমানার একেবারে শেষ প্রান্তে তার ঘর। একদিকে ভদ্রা নদী, ওপারে পাইকগাছা অন্যদিকে নদী পেরোলেই দাকোপ। কাছেই ডুমুরিয়ার সীমানা। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় একসময় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই দিন কাটাতে হয়েছে তার পরিবারকে।
চিত্তরঞ্জনের বড় ভাই ও স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক দুলাল কৃষ্ণ মহলদার বলেন, আমাদের বাড়িটি তিন-চারটি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায়। একসময় এখানে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এমনকি চুরি-ডাকাতির ভয়ও ছিল।
সেই প্রতিকূলতার মধ্যেই শৈশবে ঘটে যায় চিত্তরঞ্জনের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে চোখে কাঠির আঘাত লাগে। শুরু হয় প্রচণ্ড ব্যথা ও যন্ত্রণা। পরে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের দেওয়া ইনজেকশনের প্রতিক্রিয়ায় একটি চোখ বসে যায়। আর অন্য চোখে পড়ে ছানি। ধীরে ধীরে দুটি চোখের আলোই চিরতরে নিভে যায়।
শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট চিত্তরঞ্জনের মনে। যে সন্তানদের হাত ধরে বড় করেছেন, তাদের মুখ কোনোদিন দেখতে পারেননি। দেখতে পাননি স্ত্রীকেও। চিত্তরঞ্জন আক্ষেপ করে বলেন, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের মুখ কোনোদিন দেখতে পাইনি। ছোটবেলায় যখন সন্তানরা ছোট ছিল, তাদের হাত ধরে নিয়ে যেতাম, কিন্তু তাদের মুখ দেখার ভাগ্য হয়নি।
দৃষ্টিশক্তি হারালেও নিজের জীবনকে থামিয়ে দেননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস গড়ে তোলেন। প্রায় ১৮ বছর আগে ব্রেন টিউমারে তার স্ত্রী মারা যান। দুই মেয়ের বিয়ে ও এক ছেলে দূরে চাকরি করার পরও সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হতে চাননি তিনি।
নিজের জীবন নিয়ে চিত্তরঞ্জনের সরল উপলব্ধি, ছোটবেলায়, বোধহয় চার-পাঁচ বছর বয়সে দৃষ্টি হারিয়ে যায়। তারপর থেকে এভাবেই চলছি। পরমেশ্বরই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ ধরা আর গৃহস্থালি কাজ নিয়েই কাটে তার দিন। গরুর জন্য ঘাস কাটা, গোয়াল পরিষ্কার করা ও খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে রান্না সবই করেন নিজ হাতে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী এসব পশুপাখির সঙ্গে তার তৈরি হয়েছে এক গভীর মায়ার সম্পর্ক।
তিনি বলেন, আমি তাদের কাছে না গেলে ভালো লাগে না, তারাও আমার কাছে না এলে থাকতে পারে না। কাজ করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে। কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ওরা আমার মনের ভাষা বোঝে, আমিও ওদের ভাষা বুঝি।
দা দিয়ে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, লাকড়ি কাটা কিংবা মাটির চুলায় রান্না করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করেন তিনি। তার এই আত্মনির্ভরশীল জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন ভাইয়ের পুত্রবধূ প্রিয়াঙ্কা মহলদার।

প্রিয়াঙ্কা বলেন, আমার কাকাশ্বশুর চিত্তরঞ্জন কারও কাছ থেকে সাহায্য নিতে পছন্দ করেন না। নিজের কাজ নিজেই করতে ভালোবাসেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের প্রায় সব কাজই তিনি একাই করেন। ঘাস কাটেন, গরুকে খাবার দেন, হাঁস-মুরগির দেখাশোনা করেন। এমনকি হাটে-বাজারে যাওয়া-আসাও নিজেই করেন। আমরা সহযোগিতা করতে গেলেও তিনি নিতে চান না।
আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার মানসিকতা থাকলেও অর্থকষ্ট তার নিত্যসঙ্গী। স্থায়ী কোনো আয় নেই। ছেলের পাঠানো সামান্য কিছু টাকা এবং হাঁস-মুরগি ও ডিম বিক্রির আয়েই কোনোমতে চলে তাঁর দিন।
তিনি বলেন, আমার তো ১০টা টাকা আয় করার ক্ষমতা নেই। ছেলেটা দু-এক পয়সা দেয়, আর দু-একটা হাঁস-মুরগি ও ডিম বিক্রি করে কোনোমতে চলছি।
সন্তানদের সংসারে গিয়ে থাকার সুযোগ থাকলেও তা চান না চিত্তরঞ্জন। জন্মভিটা ছেড়ে অন্যের সংসারে গিয়ে থাকা কিংবা সন্তানদের কাছে বোঝা হতে তার আপত্তি।
তিনি বলেন, ওদের তো নিজস্ব সংসার আছে। এখনকার দিনে নিজেদের সংসার চালানোই কঠিন, তার ওপর আমার বোঝা নেওয়া তাদের জন্য আরও কঠিন হবে। আমার কাছে আমি বোঝা নই, কিন্তু অন্যের কাছে তো যেকোনো সময় বোঝা হয়ে যেতে পারি।
বৃদ্ধাশ্রমেও যেতে চান না তিনি। যে ভিটায় শৈশব কেটেছে, জীবনের শেষ দিনগুলোও সেখানেই কাটাতে চান। মাটির ঘর, গবাদিপশু আর হাঁস-মুরগিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তার ছোট্ট জগৎ।
তবে এই স্বনির্ভর জীবনের আড়ালেও রয়ে গেছে গভীর এক আক্ষেপ। যে পৃথিবীতে এত বছর ধরে বেঁচে আছেন, তার সৌন্দর্য কখনো দেখা হয়নি। চাঁদের আলো কিংবা প্রকৃতির রং তার অজানা। সবচেয়ে বড় না-পাওয়া স্ত্রী ও সন্তানদের মুখ দেখতে না পাওয়া।
পৃথিবীর রূপ-রং দেখার ইচ্ছা জাগে কিনা জানতে চাইলে চিত্তরঞ্জন বলেন, আক্ষেপ তো থাকেই। সবারই দুনিয়া দেখার ইচ্ছা থাকে। সুন্দর আলো, চাঁদের আলো, পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার ইচ্ছা আমারও ছিল। কিন্তু পরমেশবরের বিধান, কিছু করার নেই। সেই আক্ষেপ নিয়েই বেঁচে আছি। কখনো তো দেখতে পাইনি, তাই পৃথিবীটা কেমন, তার রং কেমন তা আমার জানা হলো না।

