সৈয়দপুরে বিহারি ক্যাম্পে ৭০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের ২৪টি অবাঙালি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ ও বৈধ সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। ক্যাম্পের হাজারো পরিবার নিয়মিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও ব্যক্তিপর্যায়ে বিল পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এতে এসব ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিলের মোট বকেয়া প্রায় ৭০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ক্যাম্পবাসীদের নিজ দায়িত্বে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার কথা। একই সঙ্গে এর আগের সময়ের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল হিসেবে ৪০ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৬২ টাকা পরিশোধের নির্দেশনাও রয়েছে। নতুন করে বৈধ সংযোগ ও প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্যাম্পবাসীদের বাধার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২৪ সালের ২৬ জুন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করে। চিঠিতে আদালতের রায়ের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে অবাঙালিরা বাংলাদেশের নাগরিকের মর্যাদা পাওয়ায় তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল সরকারিভাবে বহন করার সুযোগ নেই। এরপর থেকে তাদের ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের মার্চের আগের সময়ের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল হিসেবে ৪০ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৬২ টাকা পরিশোধের বিষয়টিও আদালতের নির্দেশনায় রয়েছে।
পরবর্তীতে ক্যাম্পবাসীদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে মামলা করা হলে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ আদালত নতুন করে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার স্থাপনের পাশাপাশি ২০১৬ সালের মার্চের আগের বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়ে আগের রায় বহাল রাখেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি সিদ্ধান্তের পর নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) ক্যাম্পগুলোর বিদ্যুৎব্যবস্থা নিয়মিত করার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে ক্যাম্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, প্রচার-প্রচারণা এবং নতুন মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ে নতুন মিটার বা বৈধ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ এখনো সফল হয়নি।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৫ মে নেসকোর ৮২তম বোর্ড সভায় অবাঙালি ক্যাম্পগুলোর বকেয়া ও চলমান বিদ্যুৎ বিল আদায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরও ক্যাম্পগুলোতে বৈধ সংযোগ ও নতুন মিটার স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, পুনর্বাসন করা হলে তারা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিতে প্রস্তুত। তবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমিতে বসবাস করার কারণে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
সাবা আঞ্জুম নামে এক নারী ক্যাম্পবাসী বলেন, পুনর্বাসন করে দিলে আমরা অবশ্যই বিদ্যুৎ বিল দেব। আমরাও আর এভাবে কষ্ট করে থাকতে চাই না। আমাদেরও তো একটু খোলামেলা পরিবেশে ভালোভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে।
প্রবীণ ক্যাম্পবাসী হুমায়ুন আহমেদ বলেন, আমরা সরকারি জায়গায় থাকি। এখন সরকারকে আবার বিল দিতে হবে, এটা কেমন কথা?
ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির মাজিদ ইকবাল বলেন, মামলা-মোকদ্দমায় একটা জাজমেন্ট এসেছে যে মিটার লাগিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে কোনো সরকারি গেজেট আমরা এখনো পাইনি।
সৈয়দপুর শহরের ২৪টি অবাঙালি ক্যাম্পে হাজারো পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিদ্যুতের ব্যবহার থাকলেও বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এখন বড় আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল গফুর সরকার বলেন, এই লাইনগুলো আইনানুগভাবে নিয়মিত করা হোক। ক্যাম্পবাসীদের প্রতি আহ্বান জানাব, আপনারা বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করুন।
নেসকো সৈয়দপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে আমরা বসেছি। পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে, ২০১৬ সালের মার্চের ২৮ তারিখের পর থেকে কোনো ধরনের বিদ্যুৎ বিল সরকার আর বহন করবে না।
তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে ক্যাম্পগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়মিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।



