ঝিনাইদহ/৩৮২ ধারণক্ষমতার কারাগারে থাকেন ১২১০ বন্দি

ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি বন্দি। ৩৮২ জনের ধারণক্ষমতার কারাগারটিতে বন্দির সংখ্যা এক হাজার ২১০ জন। অতিরিক্ত বন্দির কারণে আবাসন, খাবার, পানি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তাসহ কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান এবং নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের কারণে ঝিনাইদহ কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বন্দিকে সামলাতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলেও বর্তমানে কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি রাখার মতো জায়গা রয়েছে। ফলে এ মুহূর্তে আবাসন নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।
কারা সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ৩৮২ জন বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এর বিপরীতে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত বন্দি ছিলেন ১ হাজার ২১০ জন। অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও সেলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক বন্দিকে রাখতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিসর কমে গেছে। রাতে ঘুমানোর জায়গা নিয়েও বন্দিদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কারারক্ষী জানান, অতিরিক্ত বন্দির চাপ শুধু আবাসনেই সীমাবদ্ধ নয়; খাবার প্রস্তুত, পানি সরবরাহ, গোসল, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য নির্ধারিত সময়ে খাবার সরবরাহ এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
কারাগারে চিকিৎসাসেবা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারারক্ষীদের দাবি, জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসকের প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে সেবা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে পরিবহন ব্যবস্থাও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অভিযোগ, কারাগারে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সও নেই।
এদিকে বন্দিদের স্বজনদের পক্ষ থেকে কারা ক্যান্টিনের পণ্যের দাম নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, ক্যান্টিনে কিছু পণ্য বাইরে প্রচলিত দামের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনার একটি ক্যান্টিনে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান তুহিন বলেন, কোনো ব্যক্তি আদালতে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিচারাধীন বন্দি। তাই বিচারাধীন মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে কারাগারে বন্দির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। জামিনযোগ্য ও অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ড. আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে বন্দিদের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নতুন ভবন নির্মাণ, চিকিৎসাসেবা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো দরকার। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বন্দি থাকা শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়া, কারা ব্যবস্থাপনা ও বন্দিদের মানবিক সেবার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, অপ্রয়োজনীয় আটক কমানো এবং কারাগারের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, হঠাৎ করেই কিছু বন্দির চাপ বেড়েছে। বন্দিদের অধিকাংশই মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কারাগারে যে জায়গা রয়েছে, তাতে অতিরিক্ত বন্দি রাখতে সমস্যা হচ্ছে না। আগে বন্দিরা যে পরিমাণ জায়গা বরাদ্দ পেতেন, এখনো তেমনটাই পাচ্ছেন।
কারাগারের ক্যান্টিনের বিষয়ে জেল সুপার বলেন, ক্যান্টিনটি সরাসরি কারা কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্য বাইরে প্রদর্শন করা আছে। সেই অনুযায়ীই পণ্যের দাম নেওয়া হয়। বেশি টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
