
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে এক্সরে সেবা। হাসপাতালের দুটি এক্সরে মেশিনের একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। অন্যটি দিয়ে এতদিন রোগীদের সেবা দেওয়া হলেও গত ৩ সেপ্টেম্বর সেটিও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে গিয়ে প্রায় চার গুণ বেশি টাকা খরচ করে এক্সরে করাতে হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালের এক্সরে মেশিন বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেকে আর্থিক সংকটের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে পারছেন না। আবার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে আসা রোগীদের এক্সরে করাতে না পেরে ফিরে যেতে হচ্ছে। কেউ কেউ এক্সরে সেবা চালু আছে ভেবে মানি রিসিট কেটে কক্ষে গিয়ে জানতে পারছেন, মেশিনটি বিকল। পরে তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের একজন শরীয়তপুর সদর উপজেলার তুলাশার ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. রেজাউল। ২০২৫ সালের মে মাসে এক দুর্ঘটনায় তার একটি পা মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়। এরপর ঢাকায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর গত মাসে দেশে ফেরেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের অবস্থা পরীক্ষা করতে এক্সরে করানোর প্রয়োজন হয়। এ জন্য একে একে চারবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে যান তিনি। কিন্তু প্রতিবারই এক্সরে মেশিন বিকল থাকায় পরীক্ষা না করিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে তাকে।
রেজাউল বলেন, ‘ঢাকায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর গ্রামে ফিরে পায়ের এক্সরে করানোর প্রয়োজন হয়। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করাতে চারবার গিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই মেশিন নষ্ট থাকায় ফিরে আসতে হয়েছে। বাইরে থেকে এক্সরে করানোর মতো সামর্থ্যও আমার নেই। এভাবে একজন অসুস্থ মানুষকে বারবার হাসপাতালে গিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে।’
শুধু রেজাউল নন, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার সেবাপ্রার্থী শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এসে এক্সরে করাতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের অনেকেরই চিকিৎসার অংশ হিসেবে এক্সরে করানোর প্রয়োজন হয়। সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে এ সেবা পাওয়ার আশায় তারা এলেও মেশিন বিকল থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে দুটি এক্স-রে মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে একটি অনেক আগে থেকেই অকেজো। অন্য সচল মেশিনটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগীকে এক্সরে সেবা দেওয়া হতো। তবে গত ৩ সেপ্টেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেই মেশিনটিও বিকল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে হাসপাতালের এক্সরে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে বিকল মেশিনটি সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবর লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি টেকনিক্যাল দল হাসপাতাল পরিদর্শন করে মেশিনটির ত্রুটি পরীক্ষা করে গেছে। তবে এক মাসের বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত মেশিনটি সচল করা সম্ভব হয়নি। ফলে কবে নাগাদ আবার এক্সরে সেবা চালু হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি জেলা সদর হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে কার্যক্রম বন্ধ থাকাটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের এভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য এ বাড়তি ব্যয় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এদিকে একটি জেলা সদর হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এক মাসের বেশি সময় ধরে এক্সরে সেবা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। দ্রুত মেশিন সচল করে স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে রোগীদের ভোগান্তি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা।
সেবা নিতে আসা জান্নাত আক্তার বলেন, ‘আমরা দূর থেকে হাসপাতালে এক্স-রে করাতে এসেছি। এসে দেখি এখানে এক্সরে হয় না। এখন বাইরে থেকে করাতে হবে। আমরা ভেবেছিলাম হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করাতে পারব, তাই বেশি টাকা নিয়ে আসিনি। এখন বাইরে থেকে কীভাবে করাব বুঝতে পারছি না। হয়তো এক্সরে না করেই ফিরে যেতে হবে।’
আরেক সেবাপ্রার্থী কমলা বেগম বলেন, ‘আমরা জানি হাসপাতালে কম টাকায় এক্সরে করা যায়। তাই এসেছি, টিকিটও কেটেছি। এখন শুনি মেশিন নষ্ট। বাইরে থেকে করানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব? আমরা চাই, এই হাসপাতালেই দ্রুত এক্স-রে সেবা চালু হোক।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আকরাম এলাহি বলেন, ‘হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে সেবা চালু রয়েছে। তবে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত এক মাস ধরে মেশিনটি বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি টেকনিক্যাল দল মেশিনটি পরিদর্শন করে গেছে। আগামী সাত দিনের মধ্যেই মেশিনটি সচল হবে বলে আশা করছি।’
