logo

মানিকগঞ্জ/নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য তেওতা জমিদারবাড়ি, অবহেলায় পর্যটন সম্ভাবনা

অভি হাসান
মানিকগঞ্জ
নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য তেওতা জমিদারবাড়ি, অবহেলায় পর্যটন সম্ভাবনা
জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য তেওতা জমিদারবাড়ি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজধানী ঢাকার কাছেই মানিকগঞ্জ। সহজ যোগাযোগের কারণে এক দিনের ভ্রমণে ঘুরে দেখা যায় জেলার জমিদারবাড়ি, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও নদীকেন্দ্রিক নানা স্থান। সাটুরিয়ার বালিয়াটি ও শিবালয়ের তেওতা জমিদারবাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর স্মৃতিও। পদ্মা, যমুনা ও কালীগঙ্গার মতো নদী আর গ্রামীণ প্রকৃতি মিলিয়ে মানিকগঞ্জে রয়েছে বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্ভাবনা।

তবে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও প্রচারের ঘাটতি রয়েছে। ফলে ঢাকার এত কাছে হয়েও মানিকগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনা যে অবহেলায় পড়ে আছে।

মানিকগঞ্জের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদারবাড়ি। উনিশ শতকে নির্মিত এই প্রাসাদ কমপ্লেক্সে রয়েছে একাধিক ভবন, সিংহদুয়ার, পুকুর ও স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। একটি ভবনে রয়েছে জাদুঘরও। ঈদ ও সরকারি ছুটির দিনে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়।

বালিয়াটি জমিদারবাড়ির সহকারী কাস্টোডিয়ান নিয়াজ উদ্দিন জানান, ২০২৫ সালে শুধু টিকিট বিক্রি থেকে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এই রাজস্ব থেকে বোঝা যায়, ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে।

বালিয়াটি জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণে ঘাটতিতে হারাচ্ছে ঐতিহ্যের ছাপ।
বালিয়াটি জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণে ঘাটতিতে হারাচ্ছে ঐতিহ্যের ছাপ।

তবে বর্তমানে সরেজমিনে দেখা যায়, জমিদারবাড়ির বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট ক্ষয়ের চিহ্ন। অন্দরমহলের পশ্চিম পাশের কয়েকটি ভবনের কোথাও চুন-সুরকি খসে পড়েছে, কোথাও দেখা দিয়েছে জরাজীর্ণতার ছাপ। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থাপনাটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও পর্যাপ্ত নয়।

ঢাকা থেকে বালিয়াটি জমিদারবাড়িতে ঘুরতে আসা আসলাম শেখ বলেন, স্থাপনাগুলোর বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এগুলো সংস্কার করা হলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও এসব স্থাপনার ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

আরেক দর্শনার্থী বলেন, এখানে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সৌন্দর্য দুটিই রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে জায়গাটিকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে জেলার অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু বালিয়াটি নয়, মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদারবাড়িও জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদারবাড়িতে রয়েছে ৫৫টি কক্ষ। বর্তমানে এর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও দর্শনার্থীদের জন্য সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।

তেওতায় ঘুরতে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া হক বলেন, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি সংরক্ষণে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগেরও এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।

জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে শিবালয়ের ঐতিহাসিক তেওতা জমিদারবাড়ি
জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে শিবালয়ের ঐতিহাসিক তেওতা জমিদারবাড়ি

তেওতার স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক অজয় চক্রবর্তী বলেন, এসব ভবন দ্রুত সংস্কার করা না হলে একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।

মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বালিয়াটি ও তেওতার মতো আরও পুরোনো জমিদারবাড়ি, মসজিদ, মন্দির ও প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। কোনোটি এখনো দৃশ্যমান, আবার কোনোটি কালের বিবর্তনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক স্থাপনার স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক উপাদানও নষ্ট হচ্ছে।

তবে পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু পুরোনো স্থাপনা সংস্কার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ‘আমার খামার, আমার খামারবাড়ি’ রিসোর্টের কর্পোরেট সম্পর্কবিষয়ক পরিচালক কামাল হোসাইন বলেন, পর্যটন বিকাশে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, শৌচাগার, বিশ্রামের ব্যবস্থা, খাবারের দোকান, তথ্যকেন্দ্র ও প্রশিক্ষিত গাইড প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার বাড়াতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু পুরোনো ভবন নয়, এগুলো একটি এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। তাই সংরক্ষণের পাশাপাশি এগুলোকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। তবে পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যেন স্থাপনাগুলোর মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। মানিকগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিচ্ছিন্নভাবে একটি-দুটি স্থাপনা উন্নয়ন না করে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বালিয়াটি ও তেওতা জমিদারবাড়ির সঙ্গে নদী, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে যুক্ত করে পর্যটন রুট তৈরি করা যেতে পারে। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান মানিকগঞ্জের পর্যটনের বড় সুবিধা। ঢাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সহজেই এক দিনের ভ্রমণে জেলায় আসতে পারেন। কিন্তু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো, দর্শনার্থীবান্ধব সুবিধা এবং সমন্বিত প্রচারের অভাবে সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ইতিহাস-ঐতিহ্য, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতিকে সমন্বয় করে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মানিকগঞ্জে পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, পরিবহন, আবাসন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল স্থানীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।