ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপ-নির্বাচন, হাল ধরবে বিএনপি নাকি জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিজয়ী হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই সময় এ আসনের ১৮৫টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী মির্জা ফখরুল মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৪ ভোট। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম ‘হাতপাখা’ প্রতীকে ৩ হাজার ৮৯২ ভোট পেয়েছিলেন।
পরে সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দায়িত্ব পান। এবার তিনি দল থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাচ্ছেন। যার ফলে মহাসচিব এবং মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
তাই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে হবে উপ-নির্বাচন। তার রাষ্ট্রপতির খবরে ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে হবেন সংসদ সদস্য এতে চলছে আলোচনা। কেউ বলছেন, তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পাবে দল থেকে নমিনেশন, আবার কেউ বলছে জামাত হবার সম্ভাবনা বেশি।
ঠাকুরগাঁও-১ আসন মূলত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে জাতীয়তাবাদী ভোটারও বেশি। কিন্তু দেড় যুগ ধরে রাজত্ব করেছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পাটি। এর পেছনে ছিল প্রায় এক তৃতীয়াংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সমর্থন।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এখানে চার রাজনীতিক এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনই মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
উপ-নির্বাচন নিয়ে কথা হয় ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলীর সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও থেকে যেহেতু আমরা রাষ্ট্রপতি পাচ্ছি সেক্ষেত্রে এই আসনে উপ-নির্বাচন হবে। দল যাকে মনে করবেন তাকে নমিনেশন দিবেন, আমরা তার হয়ে কাজ করবো। তবে এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জাকে আমরা চাচ্ছি ১ আসন থেকে। তবে তার ভাই ফয়সাল আমিনও পেতে পারেন দল থেকে নমিনেশন।
জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফুরাতুন নাহার প্যারিস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ১ আসন যদি পূর্ণরায় আমাদের দল ধরে রাখতে চায় তাহলে এখানে দল থেকে যোগ্য ব্যক্তিকে নমিনেশন দিতে হবে। যার গ্রহণযোগ্যতা ভালো, মানুষ যাকে চায় তাকে খুব সহজে ১ আসেনর উপ-নির্বাচন থেকে আমরা জয়ী করতে পারবো। আমরা মনে হয়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যারের বড় কণ্যা এই ১ আসন থেকে যোগ্য ব্যক্তি। আমরা চাবো তাকে যেন দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
পৌরশহরের ব্যবসায়ী রেজু বলেন, বিএনপি মহাসচিব ও ১ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচনি প্রচারে অনেকগুলো অঙ্গীকার ছিল। পর্যায়ক্রমে কিছু পালন হলেও অনেকগুলো এখন হয়নি। যদি দল থেকে ভালো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে এ আসনে বিএনপি জিতবে। এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমি রাজনৈতিক দল হিসেবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের শাসন আমলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই সংগ্রাম করেছি। আপনারা জানেন, আমাদের ঠাকুরগাঁও কতটা সম্ভাবনাময় একটি জেলা। এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিগত দিনে কতটা পিছিয়ে রাখা হয়েছে। এটি এখনো অনুন্নত একটি জেলা, পিছিয়ে পড়া জেলা। আমাদের এ জেলাকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু আমার ভাই রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, তাই ১ আসনে উপ-নির্বাচন হবে। আমি ১ আসনের জন্য দল থেকে মনোনয়ন চাই। যেন ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তৃপ্তি পায়। জয় তো প্রার্থীর হয় না। জয় হয় ভোটারের। ভোটাররা যদি নির্বিঘ্নে নিরাপত্তার সঙ্গে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটাই হবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয়। আমি মনে করি, শান্তিপ্রিয় জেলা ঠাকুরগাঁও। এ জেলায় সংঘ্যালঘুর সংখ্যা একটু বেশি। তারা আমাদের কাছে নিরাপদ। এখন পর্যন্ত কোনো সংঘ্যালঘু নির্যাতনের শিকার হয়নি আমাদের দলের কাছ থেকে এবং তারা নিরাপদ হিসাবে বসবাস করে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, পিছিয়ে পড়া এ আসনে বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। উত্তরের কৃষিভিত্তিক এ জেলায় কোনো কৃষি ইপিজেড নেই, বিসিক শিল্পনগরী নেই, পরিত্যাক্ত্য বিমানবন্দরটি পূণর্রায় চালুর উদ্যোগসহ ব্যাপক উন্নয়ন করা সম্ভব। আমি তরুণদের নিয়ে কাজ করবো। জেলায় বেকারত্বের হার একটু বেশি, যখনই শিল্পকলকারখানা গড়ে উঠবে তখনই বেকারত্বের হার কমে যাবে।
আবারও ধানের শীষের কান্ডারির সঙ্গে ভোটযুদ্ধ হবে আরেক হেভিওয়েট প্রার্থীর। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঠাকুরগাঁও উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন।
দেলোয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঠাকুরগাঁও থেকে যেহেতু আমরা রাষ্ট্রপতি পাচ্ছি, তাই ১ আসনে উপ-নির্বাচন হবে। আগে এই আসনে তিনটি দলের শাসন মানুষ দেখেছে। তারা কেউ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ উপহার দিতে পারেনি। এজন্য জনগণ সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও আল্লাহ ভীরু প্রার্থীর অপেক্ষায় আছে। তাদের প্রত্যাশা পূরণে আমরা কাজ করছি। আমি অল্প কিছু ভোটে হেরে গেছি।
তিনি বলেন, অনেক নির্যাতিত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে এবং অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। এ নতুন বাংলাদেশে আমার নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাঙ্ক্ষিত সমাজ বিনির্মাণ করতে আমি সবাইকে পাশে চাই। সেইসঙ্গে আমার সম্ভাবনার জেলার যত সম্ভাবনা আছে সব দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই। বেকারমুক্ত যুবসমাজ হলে ঠাকুরগাঁওয়ে উন্নত জেলা গড়া সম্ভব। আমি সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে আমাদের আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা নিয়ে যাচ্ছি এবং আমার পাশে থাকার দাওয়াত দিচ্ছি৷ আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে একটি সুন্দর সাজানো গোছানো শান্তিপূর্ণ জেলা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ্।
দেলোয়ার আরও বলেন, যদি নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক থাকে তাহলে আমি নির্বাচিতত হবো। মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। এ আসনে তরুণদের নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। সে লক্ষ্যে আমি বিভিন্ন ইউনিয়নে জনসংযোগ করছি। বেকারত্ব দূর করবো। ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন হবে যা বিগত সরকারের আমলে হয়নি।
উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬০৯। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৩। নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬২২ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। এখানে সংখ্যালঘু ভোটার ১ লাখ ১৯ হাজার। তরুণ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। ভোটকেন্দ্র ১৭৫টি।
জাতীয় সংসদের ৩নং এই আসনে বিগত সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা হলেন— ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির খাদেমুল ইসলাম। ১৯৮৮ সালে জাপা থেকে রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী। ১৯৯১ সালে খাদেমুল ইসলাম জয় লাভ করেন আওয়ামী লীগ থেকে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে খাদেমুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালের উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন রমেশ চন্দ্র সেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের টিকিটে জেতেন রমেশ চন্দ্র সেন।






