
কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে অলিগলিতে আবারও আলোচনায় কিশোর গ্যাং। মহল্লাভিত্তিক ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একদিকে চলছে আধিপত্য বিস্তার, অন্যদিকে মাদক, অস্ত্র, মারামারি ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল মহড়া। বয়সে কিশোর হলেও এসব গ্রুপের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বড় তরুণদের নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরের হাউজিং, ঈদগাহপাড়া, কোর্টপাড়া, থানাপাড়া, হরিশংকরপুর, কালিশংকরপুর, আড়ুয়াপাড়া, আমলাপাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় কিশোরদের দলবদ্ধ চলাফেরা ও তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও কয়েকজন, আবার কোনো কোনো দলে ১০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। শহর এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও সক্রিয় কিশোর গ্যাং চক্র। স্থানীয়দের পরিসংখ্যানে এ সংখ্যা ১২ শ’র বেশি। তবে বর্তমানে সক্রিয় গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও সদস্যসংখ্যা নিয়ে পুলিশের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া শহরে বিভিন্ন সময়ে ব্যাচভিত্তিক ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, ব্যাড বয়েজ, বিএসবি, এইচএসবি, আরএলবি, সিডব্লিউবি, আরডিএক্স, আরডেন্ট বয়েজ, কেসিবি, ডিবি, কেকেজি, ভিডিএলইএমবি ও ‘০০৭’সহ বিভিন্ন নামের কিশোর গ্রুপের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের আড্ডা যেন ছড়িয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট কিছু নির্জন স্পট ঘিরে। হাউজিং এলাকায় পরিত্যক্ত ভবন ও ফাঁকা জায়গা, ঈদগাহপাড়ায় নির্জন গলি ও মাঠের আশপাশ, কোর্টপাড়ায় ভবনের পেছনের ফাঁকা অংশ ও অলিগলি, থানাপাড়ায় নির্জন সড়ক ও নদীর পাড়, হরিশংকরপুর ও কালিশংকরপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ও ফাঁকা জায়গা, আড়ুয়াপাড়া ও আমলাপাড়ার বিভিন্ন গলিপথ এবং পূর্ব মজমপুর ও জাউতলার নির্জন সড়কের পাশে সন্ধ্যার পর দলবদ্ধ কিশোর-তরুণদের আনাগোনা দেখা যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কোথাও মোটরসাইকেল নিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান, কোথাও আবার দলবদ্ধ আড্ডা ও উচ্চ শব্দে গান-বাজনা চলে। শুধু তাই নয়, এসব জায়গা মাদক সেবন, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠছে, যার প্রভাব পড়ছে আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তায়।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে শহরে ১৩টি কিশোর দলের কথা বলা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা জানা যায়, রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালীরা তাদেরকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার ও অপরাধমূলক কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এসব গ্যাংয়ের অধিকাংশ সদস্য দেশীয় তৈরি ধারালো অস্ত্র, ড্যাগার, চাকুসহ অন্যান্য অস্ত্র সব সময় নিয়ে বেড়ানোর তথ্য রয়েছে।
কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জড়িত সাইফ বলেন, ‘শুরুতে কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিতাম। পরে বড় ভাইদের সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে তাদের গ্রুপে জড়িয়ে পড়ি। প্রথমে শুধু ঘোরাঘুরি করতাম, পরে কোথাও ঝামেলা হলে দল বেঁধে যাওয়া শুরু করি। এভাবেই কখন যে আড্ডা থেকে মারামারি আর নানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি, বুঝতেই পারিনি। বড়রা বললে অনেক সময় এমন কাজও করেছি, যেটা করা ঠিক ছিল কি না, তখন ভাবিনি।’
মোটরসাইকেল মহড়া, আধিপত্য বিস্তার ও খুন
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুতগতিতে চলাচল ও মহড়া দিয়ে বেড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিশোরদের বেপরোয়া চলাফেরার সঙ্গে মডিফাই করা মোটরসাইকেলের ব্যবহারও বাড়ছে। কিছু মোটরসাইকেলের মাডগার্ড খুলে কিংবা সাইলেন্সার-এক্সহস্টে পরিবর্তন করে উচ্চ শব্দে চলাচল করা হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আবাসিক এলাকা ও ব্যস্ত সড়কে এসব মোটরসাইকেলের বিকট শব্দে পথচারী ও বাসিন্দারা অস্বস্তিতে পড়ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বেলায় বারবার এমন শব্দে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘুম ও স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং শক্তির জানান দিতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কুষ্টিয়ায় কিশোর অপরাধ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং গ্যাংভিত্তিক সংঘাতের একাধিক নজির উঠে এসেছে। বিরোধ থেকে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কুষ্টিয়ায় তরিকুল ও মিলন হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কুষ্টিয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন কুষ্টিয়া জেলা কারাগার ভেঙে পালানোর নেতৃত্ব প্রদানকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শেখ সজীব ওরফে এসকে সজীব। কোনো কোনো সূত্রের দাবি, তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০০ কিশোর-তরুণ ছিল। তৎকালীন সময়ে তিনি শহরের বিভিন্ন মহল্লাভিত্তিক গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতেন।
বর্তমানে এসকে সজীব পলাতক থাকলেও তার সঙ্গে আগে চলাফেরা করা কয়েকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ে সক্রিয় রয়েছে। কেউ কেউ বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবিও পেয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে সজীবের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে মিলন হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং গ্যাং-সংশ্লিষ্ট নানা অপরাধের তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের ৮ মে খোকসার শোমসপুরে এক যুবককে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর কিশোর গ্যাংয়ের দলবদ্ধ সহিংসতার বিষয়টি আবারও সামনে আসে।
এ ঘটনার এক মাস পরেই গত ৩ জুলাই রাতে কুমারখালীর লালনবাজার এলাকায় ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম আরিফকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে হাতুড়িপেটা করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে। পরে পাঁচ থেকে ছয়টি মোটরসাইকেলে করে একদল লোক তার গ্রামের বাড়ি হাঁসদিয়া চরে গিয়ে হামলা ও কয়েক দফা গুলিবর্ষণ করে বলে অভিযোগ করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
গত ২১ আগস্ট দৌলতপুরে টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও মোটরসাইকেলসহ আনন্দ মোল্লা (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং কিশোর গ্যাংয়ের ‘রিং লিডার’ হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় একাধিক অভিযোগ থাকার কথাও পুলিশ জানিয়েছে।
মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
কুষ্টিয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক সেবন ও মাদক কেনাবেচার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন মাদকবিরোধী সংগঠন, মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে টাপেন্টাডল, টাইডল, ইয়াবা ও গাঁজাজাতীয় নেশাদ্রব্য ব্যবহারের প্রবণতার কথা জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও আড্ডা থেকেই মাদকের সঙ্গে পরিচয়, পরে দলবদ্ধভাবে মাদক সেবনের মাধ্যমে তা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। মাদক সেবনের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ ছিনতাই, চুরি, মারামারি কিংবা অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি কিশোরদের ব্যবহার করে সরবরাহ ও কেনাবেচার কাজে যুক্ত করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠছে।
মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা হাসিবুর রহমান রিজু বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে মাদকের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। মাদক সহজলভ্য থাকলে কিশোরদের একটি অংশ সহজেই অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তাই শুধু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ ও বিস্তার বন্ধ করতে হবে। মাদক নির্মূল করা সম্ভব হলে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরিবারের নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা, মাদক ব্যবসায়ীর মূল হোতাদের চিহ্নিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শুধু মাদকসেবী কিশোরদের আটক বা মামলা দিয়ে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে কারা, সরবরাহের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং মাদক কেনার অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল হক বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের ৬০-৬৫ শতাংশ মাদকসেবী। এরা ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনের ভূমিকা জরুরি, তবে এসব কিশোর গ্যাংয়ের পরিবার, বিশেষ করে বাবা-মাকে আরও বেশি ভূমিকা রাখার প্রয়োজন।’
সচেতন মহল বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কিশোরদের আটক বা মামলা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিশোরদের পেছনে অপেক্ষাকৃত বড় বয়সী তরুণ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকার অভিযোগ উঠে এসেছে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মিরাজুল বলেন, ‘কুষ্টিয়া শহরের অলিগলিতে কিশোরদের দলবদ্ধ উপস্থিতি নতুন কোনো দৃশ্য নয়। কিন্তু সেই দল যদি মাদক, বেপরোয়া মোটরসাইকেল, আধিপত্য ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেটি আর কেবল কিশোরদের আড্ডার বিষয় থাকে না। হয়ে ওঠে নগরীর নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, পুলিশের চলমান চেকপোস্ট ও অভিযান এই তৎপরতার দৃশ্যমান পরিবর্তন কতটা আনতে পারে।’
কিশোরদের পাশাপাশি এসব দলের অর্থদাতা, মাদক সরবরাহকারী, অস্ত্র বা অপরাধে ব্যবহারকারী এবং নেপথ্যের নেতৃত্ব শনাক্ত করাকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
সচেতন মহল, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন যা বলছে
কুষ্টিয়া কোর্টের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট শামিম উল হাসান অপু বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে শুধু কিশোররা নয়, সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন। তাই বিষয়টিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে জননিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিশোরদের যারা অপরাধে ব্যবহার করছে এবং মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে অভিভাবকদের সন্তানের বন্ধু-বান্ধব, চলাফেরা, রাতের আড্ডা ও আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সময়মতো সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলে তাকে ভুল পথে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবারকেই প্রথম ভূমিকা রাখতে হবে।’
নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, ‘প্রথম দিকে বুঝতেই পারিনি, আমার ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মিশে কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডায় জড়িয়ে পড়েছে। রাতে বাইরে থাকা, হঠাৎ বেশি টাকা চাওয়া ও নতুন বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা নিয়ে এখন সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে—এ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। পরে জানতে পারি, সে মারামারির ঘটনাতেও জড়িয়েছে। এখন নিয়মিত তার চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে নজর রাখছি। শুধু পুলিশ দিয়ে এই সমস্যা সমাধান হবে না, সন্তানদের নিরাপদ রাখতে পরিবারেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’
কুষ্টিয়া জেলার গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের যেমন কোনো দল থাকে না, যখন যে দল ক্ষমতায় তাদের ব্যবহার করে ঠিক তেমনিভাবে কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হয়। এসব কিশোর খাতা-কলম নিয়ে টেবিলে পড়াশোনা করার কথা। ড্যাগার-পিস্তল নিয়ে এখন তারা মাঠে সক্রিয়ভাবে দুর্বৃত্তায়নের কাজ করছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের আবির্ভাব করানোর চেষ্টায় কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এদের দিয়ে তারা অনেক বড় আকারে দুর্ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে যারা, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদক, বেপরোয়া চলাফেরা ও অপরাধী চক্রের প্রভাব থেকে কিশোরদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মূল কারণগুলোও চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ে আমরা খুব সিরিয়াস। কিশোররা সন্ধ্যার পর কোথায় কোথায় থাকে, যেখানে একত্রিত হয়, সেখানে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’


