সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চান বিশেষজ্ঞরা

সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালুর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষা ও কারিগরি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, পুরোনো কারিকুলাম ও গতানুগতিক শিক্ষা দিয়ে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক কর্মবাজারে টিকে থাকা কঠিন। এ জন্য শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবহারিক দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়াতে হবে।
রোববার (৪ অক্টোবর) কুমিল্লা টাউন হল মাঠে কুমিল্লা জেলা কারিগরি, ভোকেশনাল শিক্ষা ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন ফোরাম (টিভিইটি) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী কারিগরি শিক্ষা ও উদ্ভাবনী মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন, পেশাগত স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় ঢাকা টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ড. প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত আলী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে কয়েক বছর আগের কারিকুলাম দিয়ে বর্তমান প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তাল মেলানো কঠিন। পুরোনো কারিকুলামের মাধ্যমে প্রযুক্তির ইতিহাস শেখানো সম্ভব হলেও বর্তমান প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা কঠিন।
তিনি বলেন, শুধু সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষা নয়, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নিয়মিত পরিবর্তন আনতে হবে।
সাবেক সচিব ও ডেসকো চেয়ারম্যান ড. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নিরূপণ করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মকে শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি তৈরি করা না গেলে বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা কঠিন হবে। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়াতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, কারিকুলাম তৈরির সময় একাডেমিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক খাতের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে কারিকুলামকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সময়োপযোগী করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সপ্তাহে তিন দিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বাকি তিন দিন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে কাজের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
সমাপনী বক্তব্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তনের পাশাপাশি কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় করে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রয়োজন। ডিপ্লোমা ও বিএসসি ডিগ্রির মধ্যকার বিদ্যমান ব্যবধান দূর করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগ বাড়াতে হবে। বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সময়ে কর্মবাজারে টিকে থাকতে শিক্ষাব্যবস্থায় সময়োপযোগী পরিবর্তন জরুরি। শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম প্রণয়ন, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব।
প্যানেল আলোচনায় পিএসসি সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম, সাবেক সচিব ও ডেসকো চেয়ারম্যান ড. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া এবং ঢাকা টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ড. প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত আলী অংশ নেন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন সিসিএন শিক্ষা পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী।
