১৫ বছর পঙ্গু স্বামীর হাত ছাড়েননি দিপা, এখন থমকে চিকিৎসার লড়াই

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নওগাঁ
১৫ বছর পঙ্গু স্বামীর হাত ছাড়েননি দিপা, এখন থমকে চিকিৎসার লড়াই
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অসুস্থ স্বামীর ছায়া হয়ে আছেন দিপা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

আধুনিক সমাজে যখন সামান্য কারণে সংসার ভাঙা কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন নিত্যদিনের খবর, ঠিক তখনই নওগাঁয় দেখা মিলল এক নিখাদ ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বামীর দীর্ঘদিনের পঙ্গুত্ব কিংবা শরীরের মরণব্যাধি টিউমার, কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এক তরুণীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ভালোবাসাকে। সামাজিক ও পারিবারিক সব প্রতিকূলতা জয় করে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অসুস্থ স্বামীর ছায়া হয়ে আছেন দিপা নামের এক নারী। তবে নিয়তির নির্মম পরিহাসে, অর্থের অভাবে আজ থমকে যেতে বসেছে এই দম্পতির সাজানো সংসার।

ঘটনার সূত্রপাত ২০০৫ সালে। স্কুল ক্রিকেট খেলতে গিয়ে হিপ জয়েন্ট ভেঙে যায় নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া উত্তরপাড়া এলাকার সজিবের। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে তার শরীরে জটিল টিউমার ধরা পড়ে। ২০১১ সালে দিপা যখন এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন ভালোবেসে সজিবকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে সজিবের পায়ে বাসা বেঁধেছে প্রায় ৪ কেজি ওজনের এক বিশাল টিউমার।

শারীরিক এমন চরম অসুস্থতার কারণে দিপার পরিবার ও সমাজ এই বিয়েতে তীব্র আপত্তি জানায়। থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে সামাজিক সালিশ বৈঠক, কোনো চাপই দিপাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারেনি। সব বাধা উপেক্ষা করে পঙ্গু সজিবের হাতটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন তিনি।

সজিব জানান, ২০১৮ সালে ভারতের একটি হাসপাতালে অপারেশনের পর তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়। পা কাটার মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও দিপা একা সবকিছু সামলেছেন। সজিব বলেন, ‘আমি বহুবার ওকে বলেছি আমার মতো পঙ্গুর সঙ্গে জীবন নষ্ট না করে অন্য কোথাও চলে যেতে, কিন্তু ও রাজি হয়নি। আজ পর্যন্ত আমার খাওয়া, গোসল থেকে শুরু করে সব ও একাই করে যাচ্ছে।’

এই দম্পতির কোল আলো করে এসেছে দুটি পুত্রসন্তান। পা কাটার পর একটি অটোরিকশা কিনে তা চালিয়ে সংসার টানছিলেন সজিব। অন্যদিকে, দিপাও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে একটি এনজিওর স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু ২০২৩ সালে সজিবের পায়ে আবারও টিউমার ধরা পড়ায় চিকিৎসার খরচ মেটাতে বিক্রি করে দিতে হয় আয়ের একমাত্র উৎস অটোরিকশাটি। একই সময়ে বন্ধ হয়ে যায় দিপার স্কুলের চাকরিও। ফলে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এই পরিবারটি।

কান্নাভেজা কণ্ঠে দিপা বলেন, ‘আমি যখন সজিবকে বিয়ে করি, তখনই ওর পায়ে টিউমার ছিল। অনেক কষ্ট সয়েও আমি ওকে ছেড়ে যাইনি, আর কোনো দিন যাবও না। কিন্তু এখন আবারও ওর শরীরে টিউমার ধরা পড়ায় আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমাদের কাছে আর কোনো টাকা নেই।’

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সজিবকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, যার জন্য প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা এই অসহায় পরিবারের পক্ষে অসম্ভব।

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভুক্তভোগী পরিবারটি যদি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে চিকিৎসার সহায়তার জন্য একটি লিখিত দরখাস্ত জমা দেয়, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

বিষয় :নওগাঁ