১১৬ বছর ধরে ফাইলবন্দি রহনপুর-সান্তাহার রেললাইন প্রকল্প

দীর্ঘ ১১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার সংযোগকারী বহুল কাঙ্ক্ষিত সান্তাহার-রহনপুর রেললাইন। ১৯১০ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ যুগের পর যুগ কাগজ-কলম আর রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে আশার আলো দেখালেও সেই উদ্যোগের দৃশ্যমান কোনো ফলাফল আসেনি। ফলে বরেন্দ্রবাসীর শত বছরের প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছে এই রেললাইনটি শুধু যাতায়াতের পথ নয়; বরং পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ এলাকার উর্বর জমিতে প্রচুর পরিমাণে আম, ধান, মাল্টা, টমেটো, বরই, পেয়ারা, পাট, আখ ও গম উৎপাদিত হয়। বর্তমানে সড়কপথে এসব পণ্য পরিবহনে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়। দীর্ঘ সময় লাগায় পথে নষ্ট হয় অনেক ফলমূল ও শাকসবজি। রহনপুর সীমান্ত শুল্ক স্টেশন থেকে সরাসরি নওগাঁ ও সান্তাহারে যাওয়ার কোনো রেলপথ না থাকায় ব্যবসায়ীদের এখনও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
পণ্য পরিবহনের এই ভোগান্তি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ও সবজি ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, আমাদের সুস্বাদু আম, মাল্টা আর টমেটো সারা দেশে পাঠাতে গিয়ে গাড়ির ভাড়াতেই অনেক টাকা চলে যায়। সড়কপথে অনেক ফল নষ্টও হয়। রহনপুর থেকে সান্তাহার হয়ে সরাসরি রেল সুবিধা থাকলে কম খরচে ও দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া যেত। ব্যবসাটাও অনেক লাভজনক হতো।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই রেলপথের ফাইল আটকে রয়েছে দীর্ঘ এক শতকেরও বেশি সময় ধরে। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে গণদাবির মুখে প্রথম একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষক দলের প্রধান ডেলগ্রীন অবিলম্বে এই রেলপথ চালুর জোর সুপারিশ করেছিলেন।
এরপর ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সরকারের গঠিত জরিপ দল প্রকল্পটির পক্ষে মতামত দেয়। কর্মকর্তা আশরাফ আলী ১৯৬৪ সালে ১৯৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও নকশা হস্তান্তর করার পরও রহস্যজনকভাবে প্রকল্পটি আটকে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদেও প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বাজেট আলোচনা করা হয়। তবে কার্যকর কোনো কাজ হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে।
কিন্তু দীর্ঘদিনেও অগ্রগতি না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় তরুণ শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, শতবর্ষী প্রাণের দাবিটি বারবার অলিখিত থেকে যাচ্ছে। আমরা চাই, বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে বরেন্দ্রবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্দশা দূর করুক।
একই কথা জানালেন রহনপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, এই লাইনে ট্রেন চলবে। কত সরকার এল-গেল, কিন্তু আমাদের এই দাবি কেউ পূরণ করল না। রহনপুর স্টেশন থেকে সরাসরি নওগাঁ ও সান্তাহার যেতে পারলে আমাদের যাতায়াতের খরচ ও সময়—দুটিই অর্ধেক হয়ে যেত।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ও নওগাঁর সান্তাহার রেলপ্রকল্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬৬ মাইল দীর্ঘ এই সান্তাহার-রহনপুর রেলপথে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ—দুই ধরনের লাইন তৈরির কথা ছিল। এর আওতায় নওগাঁর ছোট যমুনা ও পত্নীতলার আত্রাই নদীর ওপর দুটি রেলসেতু নির্মাণ এবং সান্তাহার, নওগাঁ শহর, হাঁপানিয়া হাট, হযরতপুর, জাহাঙ্গীরাবাদ, মহিষবাথান, নজিপুর, মধইল, সাপাহার, সারাইগাছী বাজার, বেজোড়া ও দাদপুর হয়ে রহনপুর পর্যন্ত মোট ১১টি স্টেশন রাখার কথা বলা হয়।
স্থানীয়দের মতে, রহনপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শুল্ক স্টেশন হওয়ায় এই রেললাইন চালু হলে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কিন্তু প্রশাসনিক অবহেলা ও অগ্রাধিকারের অভাবে প্রকল্পটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। তাদের প্রশ্ন, কবে শেষ হবে এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কবে বরেন্দ্রভূমিতে ছুটবে স্বপ্নের ট্রেন?
এদিকে প্রকল্পটি চালুর ধীরগতি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের (পশ্চিমাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা অনেক এবং এখনও এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে রেলপথে আমাদের দুটি জেলার দূরত্ব অনেকটাই কমে যাবে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এটি নিচের দিকে রয়েছে। তবে আশা করছি, কোনো এক সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। আমাদের বর্তমান মূল কাজ হলো বিদ্যমান রেললাইনগুলো সংস্কার করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী রাখা।
