মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা/সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে বুধবার সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলেদের ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। ইলিশ মৌসুমের শেষ সময়ে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে যতটা সম্ভব মাছ ধরে কিছুটা আয় করার চেষ্টা করার কথা তাদের। কিন্তু নদীর পাড়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। মেঘনার ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। কোনো নৌকায় ভেজা জাল শুকাতে দেওয়া হয়েছে, কেউ জাল গুছিয়ে রাখছেন, আবার কেউ নৌকার তেল-জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছেন। নদীতে জাল ফেলার বদলে ঘাটেই অলস সময় কাটাচ্ছেন অনেক জেলে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় বাজারগুলোতে ভোর থেকেই ঘাটে জেলে ও পাইকারদের হাঁকডাক এবং বেচাকেনার ব্যস্ততা থাকার কথা থাকলেও ছিল ভিন্ন চিত্র। মাছের সরবরাহ কম, ক্রেতা তুলনামূলক বেশি। স্থানীয় ক্রেতা শরিফ হোসেন জানান, সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কমে এমনটা শুনে তিনি ঘাটে এসেছেন।
বুধবার মধ্যরাত থেকে ইলিশসহ নদীতে সব ধরনের মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। তাই নিষেধাজ্ঞার আগে মাছ কিনতে নদীর পাড়ে এসেছেন তিনি। তবে এসে দেখেন, সামান্য কিছু ইলিশ এসেছে, সেগুলোও সমুদ্রের বরফ দেওয়া মাছ। নদীর মাছ নেই।
মাছ ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন বলেন, সকালে মাছ কেনার জন্য ঘাটে এসেছেন। সরবরাহ কম থাকায় দামও বেশি।
পাইকার মাহমুদুল হাসান বলেন, জেলেদের আজ শেষ সময়ে মাছ ধরার কথা ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার আগে সেই শেষ সময়টুকুতেও তারা কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। জেলেরা বলছেন, নদীতে ইলিশ কম থাকায় অনেক সময় সারাদিন মাছ ধরেও নৌকার তেল ও জালের খরচই ওঠে না। ফলে নিষেধাজ্ঞার আগের শেষ দিনটিও তাদের জন্য হয়ে উঠেছে হতাশার।
জেলে রফিক মাঝি, মোস্তফা, সিরাজ, রাছেলসহ আরও কয়েকজন জানান, বুধবার মধ্যরাত থেকে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, বন্ধ হয়ে যাবে তাদের দৈনিক আয়। অথচ থামবে না সংসারের খরচ, এনজিওর ঋণের কিস্তি কিংবা নৌকা-জালের জন্য নেওয়া মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধের চাপ।
মেঘনার পাড়ে বাঁধা নৌকা আর শুকাতে দেওয়া জালের পাশে তাই বুধবার দুপুরে মাছের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে জেলেদের দুশ্চিন্তা আগামী ২২ দিন কীভাবে চলবে তাদের সংসার?
ইলিশ মৌসুমের শেষ সময়ে এসে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর জেলেদের জীবনে নেমে এসেছে নতুন দুশ্চিন্তা। নদীতে ইলিশ নেই, আয়ও নেই, কিন্তু থেমে নেই সংসারের খরচ কিংবা ঋণের কিস্তি। নৌকা ও জাল কেনা বা মেরামতের জন্য নেওয়া এনজিও ঋণের কিস্তির পাশাপাশি মহাজনের দাদনের টাকাও পরিশোধ করতে হবে তাদের।
সদর উপজেলার চর রমনীমোহন নদীর তীরবর্তী এলাকায় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। একই ধরনের কথা জানিয়েছেন রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার জেলেরাও।
জেলেরা জানান, ইলিশের মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা ও জাল প্রস্তুত করতে তাদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। অনেকের হাতেই সেই টাকা থাকে না। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নেন, কেউ আবার মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেন। আশা থাকে, মৌসুমে ভালো ইলিশ পাওয়া গেলে মাছ বিক্রির আয় থেকে ঋণ ও দাদন পরিশোধ করবেন। পাশাপাশি চলবে সংসার। কিন্তু এবার নদীতে আশানুরূপ ইলিশ না থাকায় সেই হিসাব মিলছে না।
রায়পুর উপজেলার ৬৫ বছর বয়সী জেলে জামাল মাঝি জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছেন মেঘনা নদীতে। নদীর কোন জায়গায় কখন ইলিশের ঝাঁক পাওয়া যায়, কোথায় জাল ফেললে মাছ ওঠার সম্ভাবনা বেশি দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এসব তার জানা। কিন্তু এবার সেই অভিজ্ঞতাও যেন কাজে আসছে না।
জামাল মাঝি বলেন, এই বয়সে এসেও নদীতে নামতে হয়। মাছ ধরেই সংসার চলে। জাল ফেলছি, নদীতে ঘুরছি, কিন্তু আগের মতো ইলিশ পাচ্ছি না। অনেক দিন সারাদিন নদীতে থেকেও যে মাছ পাই, তাতে নৌকার তেলের খরচই ওঠে না। ভেবেছিলাম ইলিশের মৌসুমে কিছু টাকা জমাব। এখন নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে নদীতেই নামতে পারব না। সংসার কীভাবে চলবে আর ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, সেটাই এখন চিন্তা।
জামালের মতোই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান ফারুক পেদা। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরেন তিনি। ইলিশের মৌসুমের আগে নৌকা ও জাল মেরামতের জন্য ঋণ করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, কয়েক মাস ভালোভাবে মাছ ধরতে পারলে সেই আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসেও প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় তার সেই হিসাব এখন মিলছে না।
ফারুক পেদা বলেন, ইলিশের মৌসুমের আগে নৌকা-জাল ঠিক করতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সেই টাকা নিজের ছিল না, ঋণ করে নিতে হয়েছে। ভেবেছিলাম মাছ বিক্রি করে ঋণ শোধ করব, সংসারও চালাব। কিন্তু নদীতে আগের মতো ইলিশ নেই। নৌকার তেল, জাল ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে তেমন কিছু থাকে না। এখন আবার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আয় বন্ধ থাকবে, কিন্তু ঋণের কিস্তি তো বন্ধ থাকবে না। কীভাবে সংসার চালাব আর ঋণের টাকা শোধ করব, বুঝতে পারছি না।
এলাকার আরেক জেলে রফিজল মাঝিরও একই চিন্তা। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই। এবার ইলিশের আশায় নদীতে নেমেছি। কিন্তু জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ পাইনি। সারাদিন নদীতে থাকার পর যে মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেল, জাল ও অন্যান্য খরচই ঠিকমতো ওঠে না। এর মধ্যে সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি আছে। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে নদীতেও নামতে পারব না। সামনে কীভাবে সংসার চলবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।
জেলে সিরাজ মিয়া বলেন, বছরের কয়েকটি মাস ইলিশ ধরেই তাদের বড় একটি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। সারা বছর তারা এই সময়টির অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু এবার মাছ কম থাকায় অনেকেই প্রত্যাশিত আয় করতে পারেননি। তার ভাষ্য, একদিকে এনজিওর ঋণের কিস্তি, অন্যদিকে মহাজনের দাদনের টাকা। মাছ কম পাওয়ায় কোনটা আগে শোধ করব, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।
জেলেদের ভাষ্য, নদীতে মাছ না থাকলে শুধু মাছ বিক্রির আয় কমে না, বরং প্রতিদিনের খরচও লোকসানে পরিণত হয়। নদীতে নামতে জ্বালানি, বরফ ও খাবারের খরচ হয়। নৌকা ও জালের রক্ষণাবেক্ষণেও অর্থ লাগে। মাছ না উঠলে এসব খরচও অনেক সময় উঠে আসে না। ফলে ধারদেনা আরও বাড়তে থাকে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে স্থানীয় প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
