রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস/সমন্বয়হীনতায় তথ্যবিভ্রাট, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৫

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ভয়াবহ পাহাড়ধসে এক মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও আট শিক্ষার্থী।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৫-এর ইরানি পাহাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ৫ নম্বর ক্যাম্প ইনচার্জ (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুর রউফ বিষয়টি নিশ্চিত করে এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা পাঁচজন।
তবে ঘটনার পর নিহতের সংখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার পরস্পরবিরোধী তথ্যের কারণে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরপরই উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা প্রাথমিকভাবে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়ে জানান, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পরে উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) নিহত ও আহতদের নাম-পরিচয়সহ চারজনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে।
এর প্রায় ৩০ মিনিট পর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান এক বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যা আটজন বলে উল্লেখ করেন। ওই বিবৃতিতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর কথাও বলা হয়। সেই তথ্য উদ্ধৃত করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
তবে রাত ৮টার দিকে ৫ নম্বর ক্যাম্প ইনচার্জ (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুর রউফ স্বাক্ষরিত ক্ষয়ক্ষতি প্রতিবেদন এবং উখিয়াস্থ ১৪ এপিবিএন পৃথকভাবে নিশ্চিত করেন, ঘটনাটিতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পাঁচজন।
নিহতরা হলেন— ব্লক-১১-এর বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশেদা বেগম (১৩), এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩), ক্যাম্প-৩-এর আবদুস শুক্কুরের মেয়ে উম্মে সালমা (১২), ব্লক-৮-এর মোহাম্মদ ইলিয়াছের মেয়ে উমাইচা বিবি (১৩) এবং ক্যাম্প-৩-এর শামসুল আলমের মেয়ে শাহিদা (১৩)।
আহতরা হলেন— আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর কায়েস (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) ও নূর ফাতেমা (১০)। তাদের মধ্যে আসরা ও ফারেসা বিবিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের সময় খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করছিল। হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ভবনটির ওপর পড়ে। এতে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী মাটিচাপা পড়ে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন নিজ উদ্যোগে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, ক্যাম্প-৫-এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এপিবিএনের ভাষ্য অনুযায়ী, হেফজখানার ওপরের দিকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি মক্তব ও মসজিদের দেয়াল টানা ভারী বৃষ্টির কারণে ধসে নিচে থাকা হেফজখানার একাংশের ওপর পড়ে। সে সময় সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রী অবস্থান করছিল।
এপিবিএন আরো জানায়, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক চার শিক্ষার্থীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। আহত আটজন বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে ঘটনাস্থলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় ইরানি পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
এ নিয়ে গত তিন দিনে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গা।
এর আগে সোমবার রাতে টানা বর্ষণের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। একই দিন পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে বসতঘরের দেয়াল চাপা পড়ে সাত বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান এশিয়া পোস্টকে জানান, গত রোববার থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত জেলায় মোট ৫০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।
টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।






