logo

ভোলা খেয়াঘাটে হঠাৎ কেন থেমে গেল লঞ্চ চলাচল

ভোলা খেয়াঘাটে হঠাৎ কেন থেমে গেল লঞ্চ চলাচল
যাত্রীসংকটে আড়াই মাস ধরে বন্ধ ভোলা খেয়াঘাটের লঞ্চ চলাচল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

একসময় যাত্রীদের কোলাহল, লঞ্চের ভেঁপু আর ঘাটকর্মীদের হাঁকডাকে মুখর থাকত ভোলার ঐতিহ্যবাহী খেয়াঘাট। ভোলা-ঢাকা নৌপথের অন্যতম ব্যস্ত এই ঘাট দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত আটটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। তবে ইলিশা ঘাট চালু হওয়ার পর যাত্রী কমতে থাকায় বদলে গেছে সেই চিত্র। সর্বশেষ দুটি লঞ্চও যাত্রীসংকট ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে গত ৫ জুলাই থেকে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আড়াই মাস ধরে লঞ্চহীন হয়ে পড়েছে ভোলা খেয়াঘাট।

জেলা শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খেয়াঘাটে এখন নেই আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। ফাঁকা পড়ে আছে পন্টুন, বিভিন্ন অফিসকক্ষে ঝুলছে তালা। নেই ঘাট শ্রমিকদের হাঁকডাক, হকারদের ছোটাছুটি কিংবা নৌযান শ্রমিকদের ব্যস্ততা। লঞ্চ না আসায় কমেছে যাত্রীদের আনাগোনা। বন্ধ হয়ে গেছে ঘাটকেন্দ্রিক অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য। বেকার হয়ে পড়েছেন ঘাটের শ্রমিকরা। লোকসানে পড়েছেন ইজারাদার ও ঘাটসংলগ্ন ব্যবসায়ীরাও।

ঘাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি খোকন বলেন, একসময় সন্ধ্যা নামলেই ভোলা খেয়াঘাটে শুরু হতো ব্যস্ততা। একের পর এক লঞ্চের হুইসেল ও আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত পুরো নদীবন্দর। যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত টার্মিনাল। ভোলা-ঢাকা নৌপথ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম।

তিনি বলেন, ইলিশা ঘাট চালু হওয়ার পর যাত্রীসংখ্যা কমতে থাকে। একপর্যায়ে একের পর এক লঞ্চ এই ঘাটে আসা বন্ধ করে দেয়। ৪২ লাখ ৪ হাজার টাকা দিয়ে ঘাটটি ইজারা নেওয়ায় বর্তমানে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে লঞ্চ চলাচল পুনরায় চালু করতে পারলে ভালো হবে। তা না হলে ইজারার টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

নেই ঘাট শ্রমিকদের হাঁকডাক, হকারদের ছোটাছুটি কিংবা নৌযান শ্রমিকদের ব্যস্ততা। লঞ্চ না আসায় কমেছে যাত্রীদের আনাগোনা। ছবি : এশিয়া পোস্ট
নেই ঘাট শ্রমিকদের হাঁকডাক, হকারদের ছোটাছুটি কিংবা নৌযান শ্রমিকদের ব্যস্ততা। লঞ্চ না আসায় কমেছে যাত্রীদের আনাগোনা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঘাট শ্রমিক করিম বলেন, আগে লঞ্চে আসা মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করে যে আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চলত। এখন লঞ্চ না আসায় ঘাটের শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছেন। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। একটি লঞ্চও যদি নিয়মিত চলাচল শুরু করে, তাহলে ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আবার সচল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ঘাটের দোকানদার শরীফ বলেন, লঞ্চ চলাচল বন্ধ হওয়ায় ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। আগের মতো বেচাকেনা হয় না। সরকার উদ্যোগ নিয়ে লঞ্চ চলাচল পুনরায় চালু করলে ঘাটের পাশাপাশি তাঁদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও টিকে থাকতে পারবেন।

মেসার্স ব্রাদার নেভিগেশনের ম্যানেজার আলাউদ্দিন বলেন, এই ঘাটে লঞ্চ ভেড়ালে তাদের প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা লোকসান হয়। আগের মতো যাত্রী না থাকায় আপাতত লঞ্চ ভেড়ানো বন্ধ রাখা হয়েছে। অধিকাংশ যাত্রী এখন ইলিশা ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন।

বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, গত ৫ জুলাই থেকে এই ঘাটে চলাচলকারী ‘কর্ণফুলী-৯’ ও ‘জমজম’ লঞ্চ ভেড়ানো বন্ধ রয়েছে। ফলে এই রুট ব্যবহারকারী অনেক যাত্রী ঘাটে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইজারাদার ইজারার টাকা ফেরত চেয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছেন। মালামাল পরিবহন সহজ করা এবং অন্য ঘাটের ওপর চাপ কমাতে ভোলা খেয়াঘাটে পুনরায় লঞ্চ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে ভোলা খেয়াঘাটকে জেলার প্রথম ও একমাত্র লেবার হ্যান্ডলিং পয়েন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একসময় এই ঘাট থেকে আটটি যাত্রীবাহী লঞ্চে জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ঢাকায় যাতায়াত করতেন। যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও ছিল ঘাটটিতে। বর্তমানে ভোলায় বিআইডব্লিউটিএর অধীনে ১৪টি লঞ্চঘাট রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী খেয়াঘাটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ঘাটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।