logo

সৌরবিদ্যুতের জন্য চরের ২৩৯ একর জমি চান বিএনপির মনোনয়ন হারানো সেই কামাল

রেজাউল করিম
গাজীপুর
সৌরবিদ্যুতের জন্য চরের ২৩৯ একর জমি চান বিএনপির মনোনয়ন হারানো সেই কামাল
ধাঁধারচরে ইজারা চাওয়া ২৩৯ একর জমি। ইনসেটে কামাল জামান মোল্লা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চান গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন হারানো সেই কামাল জামান মোল্লা। এজন্য গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মিলনস্থল ধাঁধারচরে ২৩৯ একর জমি ইজারা চান তিনি।

এরইমধ্যে ধাঁধারচর মৌজার এক নম্বর খতিয়ানের ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চেয়ে আবেদন করেছেন কামাল জামান মোল্লা। এরমধ্যে নদী, বালুচর, সিকস্তি ও নালা শ্রেণির জমিও রয়েছে। পর্যটন ও জীববৈচিত্র্যের সম্ভাবনাময় এই এলাকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগে নাখোশ স্থানীয় বাসিন্দারা।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা সাননোভা এনার্জি ওপিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গত নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। পরদিনই অবশ্য সেটি স্থগিত করা হয়। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তৃতীয় হন কামাল। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে গত ১৬ আগস্ট একটি আবেদন করেন কামাল জামান মোল্লা। এতে অকৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অকৃষি খাস জমির বন্দোবস্ত বা ইজারা চাওয়া হয়।

আবেদনে বলা হয়, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং সবুজ শক্তি প্রসারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাননোভা এনার্জি ওপিসি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

নদী, সিকস্তি ও নালার জমি

কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জের ধাঁধারচর মৌজায় মোট খাসজমির পরিমাণ ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর। এর মধ্যে নদী শ্রেণির দুই দাগে রয়েছে ৩০ দশমিক ৭০ একর। বালুচর শ্রেণির তিন দাগে ১৩ দশমিক ৬৩ একর, সিকস্তি শ্রেণির ১০৬ দাগে ৪৫ দশমিক ৮২ একর এবং নাল শ্রেণির ৯০ দাগে ১৫২ দশমিক ১৫ একর জমি রয়েছে। মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির। এরপর সিকস্তি ভূমি প্রায় ১৯ শতাংশ, নদীর জমি প্রায় ১৩ শতাংশ এবং বালুচর প্রায় ৬ শতাংশ।

আবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। প্রকল্পের মাধ্যমে ওই এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ও জনমানবহীন সরকারি জমিকে পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজমের আওতায় উন্নয়ন করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ধাঁধারচর মৌজার ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়ার আবেদন করা হয়।

কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দুই নদীর মাঝে ধাঁধারচরের অবস্থান। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির লক্ষাধিক বড় গাছপালা রয়েছে। ধাঁধারচর মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানের তথ্য অনুযায়ী ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এসব জমির শ্রেণি নদী, সিকস্তি ভূমি, নালা, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত।’ প্রতিষ্ঠানটির ইজারার আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরির কথাও জানান নাহিদুল হক।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ‘নদী ও নদীসংলগ্ন ভূমি জনস্বার্থ ও পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি। আইন অনুযায়ী এ ধরনের ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়। ধাঁধারচর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এখানে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ, দেশীয় উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। পাশাপাশি কৃষিকাজও চলে। ফলে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক প্রতিবেশ। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হলে অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধাঁধারচরকে বেসরকারি বন্দোবস্ত না দিয়ে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি গবেষণা, পরিবেশ শিক্ষা ও পর্যটনের সুযোগ তৈরি হবে।’

সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলতে কামাল জামান মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করেন এ প্রতিবেদক। তবে কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।